সম্পাদকীয়

গার্মেন্ট শ্রমিকদের ঈদ-বোনাস ও বকেয়া বেতন: প্রতিবছরের একই চিত্র কেন?

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। এই শিল্পে নিয়োজিত কোটি শ্রমিকের ঘাম ও পরিশ্রমের বিনিময়ে দেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, গড়ে ওঠে উন্নয়নের ভিত। অথচ প্রতিবছর ঈদ এলেই একই চিত্র দেখা যায়Ñবেতন ও বোনাসের দাবিতে শ্রমিকদের রাস্তায় নামতে হয়, বাধ্য হয় আন্দোলনে যেতে। মালিকপক্ষের অজুহাত থাকে, অর্থসংকটের কারণে সময়মতো বেতন দেওয়া সম্ভব হয়নি। শ্রমিকদের দাবি, এটা কৃত্রিম সংকট, যা সৃষ্ট হয় সরকার ও মালিকপক্ষের স্বার্থ হাসিলের জন্য। এবারও সেই আশঙ্কা প্রবল, কারণ শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত শিল্প পুলিশ ইতোমধ্যেই সতর্কবার্তা দিয়েছে। প্রতি ঈদের মতো এবারও বেতন-বোনাস নিয়ে অস্থিরতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। পোশাক কারখানাগুলোতে আর্থিক সংকটের কারণে বেতন-বোনাস পরিশোধে বিলম্ব হলে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। ফলে এতে শুধু শ্রমিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং ঈদে ঘরমুখো সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছাবে। বিষয়টি মাথায় রেখে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এবার কোনোভাবেই রাস্তা বন্ধ করা যাবে না এবং শ্রমিকদের সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শ্রমিকদের বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে কেন প্রতিবার এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়? কেন মালিকপক্ষ আগেভাগে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেয় না? বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-এর তথ্যমতে, বেশিরভাগ কারখানাই জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির বেতন পরিশোধ করলেও এখনো বেশ কিছু কারখানা বকেয়া পরিশোধ করতে পারেনি। এমন বাস্তবতায় শ্রমিকদের ঈদের আগেই পুরো বেতন ও বোনাস পরিশোধ করা হবে কিনা, সে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, মালিকপক্ষ সবসময়ই রোজা ও ঈদের সময় বেতন পরিশোধে টালবাহানা করে। এর মাধ্যমে একদিকে তারা সরকারের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে, অন্যদিকে শ্রমিকদের জিম্মি করে অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ৭ হাজার কোটি টাকা বিশেষ তহবিল ছাড়ের দাবি জানিয়েছে গার্মেন্ট মালিকদের একটি সংগঠন। অথচ শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করতে তাদের বারবার আন্দোলনে নামতে হয়, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও অগ্রহণযোগ্য। পোশাক খাতের শ্রমিকদের প্রতি মালিকপক্ষের দায়িত্বশীলতা এবং সরকারের কার্যকর ভূমিকা এখন সময়ের দাবি। দেশের অর্থনৈতিক মেরুদ- হিসেবে পরিচিত গার্মেন্ট শিল্পের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে শ্রমিকরা। অথচ তারা ন্যায্য পাওনার জন্য প্রতিবছর ঈদের আগে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি রোধে সরকারের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা জরুরি। শুধু নির্দেশনা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না, বরং তা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। এই দুঃসহ বাস্তবতা থেকে মুক্তি পেতে হলে শ্রমিকদের অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে, এবং তা নিশ্চিত করতে হবে সময়মতো বেতন ও বোনাস পরিশোধের মাধ্যমে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button