খুলনায় সৈয়দপুর ট্রাস্টের অর্থ কেলেঙ্কারিখুলনায় সৈয়দপুর ট্রাস্টের অর্থ কেলেঙ্কারি

‘গুরুপাপে লঘুদ-’ পাওয়া
নাজির শাকুর চাকরিতে বহাল
# বেতন গ্রেডের নি¤œতর ধাপে অবনমিতকরণ
# অফিসপাড়ায় সমালোচনার ঝড়
মুহাম্মদ নূরুজ্জামান ঃ খুলনা জেলা প্রশাসকের সাক্ষর জাল করে সৈয়দপুর ট্রাস্টের ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় নাজির মোঃ আব্দুর শাকুর শেখ (ট্রেসার, রাজস্ব শাখা) গুরুতর অপরাধ করলেও তাকে লগুদ- প্রদান করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে তার বেতন গ্রেডের নি¤œতর ধাপে অবনমিতকরণ করা হয়েছে। গত ১২ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় মামলার রায়ে এ দ- প্রদান করা হয়।
এদিকে, আব্দুস শাকুরের বিরুদ্ধে কর্তব্যে অবহেলা, অসদাচরণ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা দায়ের এবং তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ‘গুরুপাপে লঘুদ-’ প্রদান করায় অন্যান্য কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এতিমধ্যেই তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন অভিযুক্ত শাকুর।
অভিযোগ উঠেছে, ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে চিহ্নিত সদ্য বিদায়ী তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার মোঃ হেলাল মাহমুদ শরীফ ও বর্তমান কর্মরত একজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনারকে ম্যানেজ করে শাকুর শেখ গুরুদ- থেকে রেহাই পেয়েছেন। বিষয়টি অফিসপাড়ায় সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সৈয়দপুর ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দায়েরকৃত বিভাগীয় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার আব্দুল্লাহ আল-ইমরান কর্তৃক দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আব্দুস শাকুর শেখের উপর সৈয়দপুর ট্রাস্টের ইজারা নথিসহ অন্যান্য নথি, ইস্যু রেজিস্ট্রার, চেক বই ও চেক রেজিস্ট্রার, আয় ব্যয়ের হিসাব ইত্যাদি ট্রাস্টের নাজির হিসেবে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা ও রিপোর্টিং এর দায়িত্ব অর্পিত ছিল। তিনি ট্রাস্টের আয়-ব্যয়ের হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেননি এবং ব্যংকের আর্থিক লেনদেনের স্টেটমেন্টও সংগ্রহ ও যাচাই করেননি। এছাড়া তিনি অদক্ষতা চরম উদাসীনতা ও দায়িত্বে অবহেলার মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অফিস সহায়ক এম সোহেল আরমানকে চেক জালিয়াতি, চুরি এফডিআর উত্তোলন কাজে সক্রিয় সহযোগীতা করেছেন মর্মে প্রতিয়মান হয়।
অপরদিকে, মামলা শুনানীতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে নাজির শাকুর শেখ দাবি করেন তিনি নাজির হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব পেলেও প্রয়োজনীয় সকল রেজিস্ট্রার বা ফাইলপত্র লিখিতভাবে বুঝে পাননি। ট্রাস্টের সুপার ভাইজার কবির হোসেনের অসুস্থতার কারনে কর্তৃপক্ষের মৌখিক নির্দেশে তিনি দায়িত্ব পালন করতেন। এছাড়া তিনি নিজেকে একজন নবীন কর্মচারী হিসেবে আখ্যায়িত করে তার ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকতে পারে এবং অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমা চান। বিভাগীয় মামলার অভিযোগনামা, অভিযোগ বিবরণী, অভিযোগনামার জবাব, তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদন, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রাদি ও রেকর্ড পরীক্ষা নীরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেন, নাজির আব্দুস শাকুর শেখ সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেট খুলনার নামে পরিচালিত ব্যংকের চেক বই, জমা বই, স্থায়ী আমানত (এফডিআর) সংক্রান্ত ডকুমেন্ট ও চেকবই ইস্যু রেজিস্ট্রারসহ অন্যান্য কাগজপত্র হেফাজতের দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু তিনি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করে কর্মজীবনে যেমন অপেশাদারিত্ব ও দায়িত্বে চরম অবহেলার পরিচয় দিয়েছেন তেমনি দাপ্তরিক কর্মকান্ডে বিঘœ সৃষ্টিসহ রাজস্ব প্রশাসন সম্পর্কে জনমনে বিরূপ ধারনা সৃষ্টি হয়েছে মর্মে প্রতিয়মান হয়। এরপরও শুধুমাত্র ‘লিখিতভাবে দায়িত্ব বুঝে না পাওয়ার’ অযুহাত দেখিয়ে তিনি ‘গুরুপাপে লঘুদন্ড’ পেয়েছেন। চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়নি তাকে।
একই অপরাধে অফিস সহায়ক এম সোহেল আরমানকে ‘ক্রিমিনাল মিসকন্ডাক’ অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে বিভাগীয় মামলায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনও মামলা দায়ের করেছে। তবে বিশাল এ অর্থ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত নাজির শাকুর সহ অন্যান্যরা পার পেয়ে যাচ্ছেন।
বিদায়ী বিভাগীয় কমিশনারের এ সংক্রান্ত আদেশের বিষয়ে খুলনা জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোন মন্তব্য করেননি।
তবে অভিযুক্ত আব্দুর শাকুর শেখ বলেন, তিনি বর্তমানে তেরখাদায় ডেপুটেশনে শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তাকে শাস্তি দিয়ে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
উল্লেখ্য, জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিভাগের (ট্রেসার) দায়িত্বে ছিলেন নাজির শাকুর। এ বিভাগের চেক বইসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ফাইলপত্র সংরক্ষণের দায়িত্ব তার। কিন্তু তিনি দায়িত্ব অবহেলা করে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারি অফিস সহায়ক সোহেল আরমানকে দিয়েই সব কাজ করাতেন। আর এ সুযোগে সোহেল চেক নিয়ে জেলা প্রশাসকের সই জাল করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেন। এমনকি ব্যাংক হিসেবেও তার নিজের মোবাইল নম্বর দেন তিনি। এমনকি শাকুর ও সোহেল যোগসাজস করে সৈয়দপুর ট্রাস্ট এবং খান-এ-সবুর ট্রাস্ট্রের সম্পত্তি তদন্তের নামে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত চলতি বছরের ২ মে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টরের স্বাক্ষর জাল করে সোহেল আরমান, ম্যানেজার, এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি, খুলনা শাখা বরাবরে ভুয়া চিঠি তৈরি করে সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের নামে রক্ষিত স্থায়ী আমানত থেকে ২৫ লাখ টাকা তার নামীয় খুলনা সোনালী ব্যাংক পিএলসি, স্যার ইকবাল রোড শাখায় স্থানান্তর করে আত্মসাৎ করেন। এছাড়া, সৈয়দপুর ট্রাস্টের একটি এফডিআর এবং ১১টি চেকের বিপরীতে অন্তত ৪০ লাখ টাকা ইসলামী ব্যাংক এবং এনআরবিসি ব্যাংক থেকে তুলে নেয়। এসব এফডিআর ও চেক ভাঙাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষরও জাল করা হয়।



