রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে নারীদের পর নির্ভরতা বেড়েছে

# খুটে যে ধান পেত তাতে সংসার চলে যেত ঃ জয়গুন #
খলিলুর রহমান সুমনঃ বাগেরহাট জেলার রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশে কৈগরদাশকাঠী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই আশ্রয়ন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। তখন নাম দেয়া হয় মুজিবকেল্লা। যা এখনও আছে। সুন্দরবন ধ্বংসকারী আর ভারতের খুশির তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার পর এখানকার মানুষ তাদের আয়ের সব উৎস্য হারায়। হয়ে পড়ে বেকার। আগে এখানে ধান ও মাছ চাষ হতো। তা দিয়ে তাদের সংসার চলে যেত। আশ্রয়ন প্রকল্পের বাসিন্দারা খুবই কস্টে আছে বলে জানান আঃ রহমানের স্ত্রী তানিয়া আফরিন। তিনি বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরের সামনে হাটু পানি জমে থাকে। পানি কোথায় দিয়ে বের হতে পারে না। কারণ আশপাশসহ নদীর তলদেশ উচু। ঘরের টিন দিয়ে পানি পড়ে। বৃষ্টি হলেই ঘরের ভিতরে থাকা কস্ট কর হয়ে পড়ে। এমন চিত্র অধিকাংশ ঘরের বলে তিনি জানান। আরেক বাসিন্দা জলিল শেখ জানান, এখানে আগে ধান ও মাছ চাষ হতো। তা দিয়ে সংসার চলে আরো বাড়তি থাকতো। ভারতের খুশিতে করা কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে আজ এলাকাবাসী বেকার হয়ে পড়েছে। আগে যে ধান আর মাছ চাষ হতো তাতে মহিলারা সহায়তা করে সংসারে খোরাকি রাখতো। এখন তো তা নেই। ফলে নারীরা পুরুষের আয়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আরেক বাসিন্দা জয়গুন বেগম, শিরিনা বেগম বলেন, গুচ্ছগ্রামে প্রায় ৫শ’ মানুষ বসবাস করে। ঘরের বাথরুমগুলো ব্যবহারের অযোগ্য হওয়ায় সবাই পাশে খোলা আকাশের নীচে মলত্যাগ করে। যা পরিবেশ দুষণ হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য হুমকির মধ্যে রয়েছে বলে তারা জানান। অবিলম্বে সমস্যা সমাধানের দাবি জানান এই ভুক্তভোগী বাসিন্দারা। তারা বলেন, আগে যারা ধান চাষ করতো। তাদের সংসার খুবই ভাল চলতো। আর যাদের জমি ছিল না তারা সেই জমিতে ধান খুটে বছরের খোরাকি রাখতো। এখন ধানও নেই। খোরাকিরও ব্যাপার নেই। সবাই স্বামীর আয়ের ওপর নির্ভরশীল। রামপাল উপজেলা গৌরম্ভা ইউনিয়নের কাপাশডাঙ্গা কৈগরদাশকাটি গুচ্ছ গ্রামের বাসিন্দা মাজহারুল গাজী। তিনি বলেন, ভারতকে খুশি করতে সুন্দরবন ধ্বংসকারী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র করে পতিত শেখ হাসিনা সরকার। তারপর থেকে তাদের এলাকায় আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যায়। এখানে নেই চাষাবাদের কোন সুযোগ। আছে শুধু হাহাকার। আর যে মাছ (বাগদা চিংড়ি) আছে তাতে এত পরিমাণ ভাইরাস যা বিক্রি করে লাভ করা কঠিন হয়ে পড়ছে ঘের মালিকদের। কারণ এই অভিশপ্ত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র করার পর এই অঞ্চলের বাগদা মাছের ঘেরে ভাইরাস মহামারি আকার ধারণ করেছে। আরেক বাসিন্দা আঃ রহমান বলেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র আর্শিবাদের স্বপ্ন দেখালেও এখন এলাকাবাসীর নিকট অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে। কারণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র তাদের করেছে বেকার। কেড়ে নিয়েছে ধান ও মাছ চাষের অধিকার। ওই সময় বলা হয়েছিল, তাদের তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে চাকুরি দেয়া হবে। কিন্তু পরে আর দেয়া হয়নি। করা হয়েছে তাদের সাথে প্রতারণা। তার ঘরের নাম্বার ৩৩। এখানে নেই হাঁস মুরগি পালনের জায়গা। নেই কোন চিকিৎসার সুযোগ। নদী পাড়ি দিয়ে চালনায় চিকিৎসার জন্য যেতে হয়। যা অনেক কস্টকর ব্যাপার। মুজিব কেল্লার বাসিন্দা সেলিনা বেগম বলেন, তার স্বামী হালিম শেখ এখন ট্রলার চালায়। তার ১২৪ নং ঘর। আগে ধান ও মাছ চাষ করতো। তা দিয়েই তাদের সংসার চলে যেত। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে তাদের উচ্ছেদ করার পর এখন গুচ্ছগ্রামে বসবাস করলেও নেই কোন শান্তি। অভাব অনাটন আর রোগব্যাধী যেন পিছু ছাড়ছে না। তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার পর এ মাটিতে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বদ্ধ পানিতে লবণাক্ততা এমন পর্যায়ে পৌ”েছে তাতে কোন কিছুই চাষ করা যাচ্ছে না। এখানে বসবাসের যোগ্য না। এক কিলোমিটার দূরে গিয়ে খাবার পানি আনতে হয়। সরকার ঘরের সাথে যে বাথ রুম করে দিয়েছে তা ব্যবহার করা যায় না। সামনের সড়ক ব্যবহার যোগ্য নয়। বৃষ্টি এলেই হাটু পানি জমে যায়। ঘর থেকে শুকনা পায়ে ঘরে ওঠা যায় না। এক বছরের ব্যবধানে গুচ্ছগ্রামের ঘর জানালা দরজা নস্ট হয়ে গেছে। এখানে আয় করার কোন ব্যবস্থা নেই। হাঁস মুরগী পালন করা যায় না। এতে করে আমি বেকার। স্বামীর আয়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়। এখানে কোন ইনকাম নেই। বাইরে থেকে আয় করে এখানে আনতে হয়। এখানকার স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। শিউলী বেগম জানান, আশ্রয়ন প্রকল্পের মুজিব কেল্লা নাম দেয় হাসিনা। এখানে ১৪২টি ঘর আছে। খাওয়া, দাওয়া, গোসল করা, ছেলে মেয়ে মানুষ করা, থাকা সমস্যা। ঘর করার পর সরকার আর খোঁজ খবর নেয়নি। কাজ নেই বলে ১৮/২০টি পরিবার চলে গেছে। আগে এখানে মাছ-ধান চাষ করা হতো। এখন চার হাত পা কোলে নিয়ে বসে আছি। আগে বড় ঘের ছিল। মাছ শাখ মেরে খেতাম। মুজিব কেল্লা আর্শিবাদ নয় অভিশাপ। দু’শতক জায়গায় ঘর। মুরগী, গরু ছাগল কিছু পালন করা যায় না। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে থেকে উচ্ছেদ করে মুজিব কেল্লা করে পুর্নবাসন করেছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার। এখন এখানে বাঁচার পরিবর্তে মরণের ব্যবস্থা করেছে। আরেক বাসিন্দা আবুল বাশার শেখ(৫৭) বলেন, তিনি ইজিবাইক চালক। কাপাশডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা। আগে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিতর জমিজমা ছিল। কৃষি ও মাছ চাষ করতেন। আগে ভারতের হাজার হাজার লোক ছিল বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। ৫ আগস্টের পর ভারতের লোক প্রায় সব চলে গেছে। এখানতার লোক কাজে নেয় না। এখানে ধান ও মাছ চাষ হতো। এখন জায়গা জমি নিয়ে গেছে তাহলে ধান ও মাছ চাষ হবে কি করে। তখন সংসার খুব ভালই চলতো। ধান যা হতো তা খেয়ে বছর চলে যেত আরো দ্যেড়ি থাকতো। সেই সময় তার স্ত্রী ও পরিবার পরিজনের সদস্যরা গৃহপালিত পশু পালন করে সংসার পরিচালনা করতে সহায়তা করতো। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার পর তা বিক্রি করে দিয়েছি। নারীরা হয়ে পড়েছে বেকার। তারা পর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আরেক বাসিন্দা আঃ হামিদ শেখ। তিনি বলেন, কৈগরদাসকাটি চরে আগে ধান ও মাছ চাষ হতো। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কারণে লবণাক্ততা বেড়েছে। ঘেরপাতাড়ি থাকলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বড় বড় বাধের কারণে পানি প্রবাহ বন্ধ। এতে পানিতে অধিক পরিমাণ লবণাক্ততা বেড়েছ। আগে ধান ও মাছ চাষ করলে তার পরিবারের স্ত্রীসহ স্বজনরা সহযোগিতা করতো । এখন একজনের আয়ের উপর নির্ভর করতে হয় পুরো পরিবারকে। এখানে ৭/৮শ’ ভোটার রয়েছে। গৌরম্ভা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ভিতর কৈগরদাশকাটি। এখন কোন কিছুই চাষ হয় না। বেকার জীবন যাপন করতে হচ্ছে। বেলার বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিতরে বসবাসকৃত জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করা হলেও তাদের সম্মানজনক পূর্ণবাসন করা হয়নি। দেয়া হয়নি আয়ের কোন উৎস। কাজ দেয়া হয়নি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভিতরে। পূর্নবাসনের নামে যে ঘর দিয়েছে তা বাবুই পাখির বাসার মত। এখানে নেই হাঁস মুরগি পালনের কোন সুবিধা। গরু ছাগল দুরে থাক। নেই মাছ চাষের সুবিধা। পূর্ণবাসনের কথা বলে উচ্ছেদ করা হলেও শুধু ঘর দিয়ে সব শেষ। কারণ তারা এখন বেকার। আগে যেখানে তারা ছিল সেখানে ছিল মাছ ও ধান চাষের সুবিধা। ছিল গৃহ পালিত পশু পাখি পালনের সুবিধা। এখন কোনটাই নেই। আছে শুধু ঘর। তারা ঘর করে দিয়ে চলে গেছে আর খবর নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। এতে করে নারীরা হয়ে পড়েছেন সম্পূর্ণ পর নির্ভর। স্বামীর আয়ের ওপরই তার সংসার চলে। এ জন্য জীবন বাঁচানোর তাগিদে অনেকে ঘর রেখে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। বিষয়টি বর্তমান সরকারকে গুরুত্ব সহকারে দেখার দাবি জানান এই নাগরিক নেতা। বাগেরহাট জেলা পরিবেশ সুরক্ষা নাগরিক কমিটির সাঃ সম্পাদক মাহাবুবুর রহমান লিটন বলেন, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারপাশের বাসিন্দারা কর্মহীন হয়ে পড়েছে। কারণ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র হওয়ার আগে এই জমিতে হতো কৃষি কাজ, পতিত জলাশয়ে হতো মাছ চাষ। এখন তারা অনেকটাই বেকার। এখন তারা যখন যে কাজ পায় তাই করেই জীবন নির্বাহ করছে। পশুর নদী থেকে জোয়ারের পানিতে আসা মাছ তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রর পাশের খাল থেকে ধরা নিষিদ্ধ করেছে বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। এতে করে খাল ও নালা থেকে মাছ ধরতে পারছে না চারপাশের দরিদ্রে বাসিন্দারা। কৈগরদাশকাটি প্রাইমারী স্কুলে ছেলে মেয়েরা লেখাপড়া শেষ করে মাধ্যমিক বিদ্যালয় যেতে কস্ট হয়। প্রায় ৩-৪ কিলোমিটার দুরে মাধ্যমিক বিদ্যালয় থাকায় গুচ্ছগ্রামের ছেলে মেয়েরা বিদ্যালয় যেতে নিরুৎসাহিত হয়। যার জন্য ওই এলাকার মেয়েদের ঝড়ে পড়া হার বাড়ছে। এলাকাবাসীর রয়েছে চিকিৎসার সংকট। গুচ্ছগ্রাম থেকে ৩-৪ কিলোমিটার দুরে কমিউনিটি ক্লিনিকের অবস্থান। অসুস্থ্য ও বয়স্ক মানুষ চিকিৎসা কেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসা নেয়া কস্ট কর হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গর্ভবর্তী মায়েদের কস্টেরসীমা নেই। তিনি বলেন, এখানে গুচ্ছগ্রামে বসবাস করে প্রায় ৬/৭শ’ মানুষ। এদের জীবনমান উন্নয়নে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নেই কোন ভূমিকা না থাকলেও বেকার হওয়ার ক্ষেত্রে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। রামপাল উপজেলা প্রকৌশলী সাদ্দাম হোসাইন বলেন, আশ্রয়ন প্রকল্পের ঘরের অভ্যন্তরে সড়কের কোন ব্যবস্থা নেই। এতে করে ওই ঘরের বাসিন্দারা জলাবদ্ধতা দেখা দেয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে বিষয়টি ইউএনও দেখভাল করেন। তার সাথে কথা বললে ভাল হয়। তারপরও তিনি ইউএনও’র সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন বলে তিনি জানান।



