স্থানীয় সংবাদ

দুবৃর্ত্তদের গুলিতে সংবাদিক খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার নাই : মামলা হয়নি

# খুলনায় অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানী ##
# আহত গ্রাম্য পশু চিকিৎসকের অবস্থা সংকটাপন্ন, খুনের ঘটনায় আতঙ্কগ্রস্থ এলাকাবাসী #
# আলামত ও বিভিন্ন বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত চলমান, আসামী গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে

স্টাফ রিপোর্টার : ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর হতে খুলনা মহানগরী এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কারনে একের পর এক হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেই চলেছে। সম্প্রতি খুলনা শহর যেন সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে হিসাবে গড়ে উঠেছে। প্রশাসন সন্ত্রাসীদের অবৈধ অস্ত্রের মহড়া ও দমনে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বলে প্রশ্ন তুলেছেন সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ। সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তার, গ্রুপিং, মাদক সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল, পূর্ব শত্রুতার দ্বন্দ্বের জেরসহ বিবিধ কারণে শান্ত খুলনা এখন আতঙ্কের নগরী হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত প্রকাশ্যে দিবালোকে খুনের ঘটনায় বিস্মিত ও শঙ্কিত নগরবাসী। এবার প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হলেন সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন (৪২)। নিহত ওই সাংবাদিক খুলনার আড়ংঘাটা থানাধীন রংপুর ইউনিয়নের কালীঘাট এলাকার বজলুর রহমানের বড় ছেলে। খুনের ঘটনায় জড়িতদের এখন পর্যন্ত পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারেনি, এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই ঘটনায় কোনো মামলাও হয়নি বলে বিষয়টি নিশ্চিত করছেন আড়ংঘাটা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহাজাহান আহম্মেদ।
বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাতে শলূয়া বাজার সংলগ্ন একটি দোকানের ভেতরে বসে থাকা সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলনকে মাথায় লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় দুবৃর্ত্তরা। ওই ঘটনায় একই এলাকার দেবাশীষ নামের এক গ্রাম্য পশু চিকিৎসকও গুলিবিদ্ধ হন। একদল দুর্বৃত্তরা গুলি ছুড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর পর স্থানীয়রা ও অন্যান্যরা গুলিবিদ্ধ দু’জনকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাংবাদিক ইমাদাদুল হক মিলনকে মৃত বলে ঘোষনা করে এবং অপর গুলিবিদ্ধ পশু চিকিৎসক দেবাশীষ গুরুত্বর অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তার অবস্থা সংকটাপন্ন বলে সূত্রে জানা গেছে। শূলয়া বাজারে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলির ঘটনার খবরে তাৎক্ষনিক আড়ংঘাটা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে এবং ঘটনাস্থল হতে ৩ টি গুলির খোসাসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধার ও জব্দ করেন।
খুন ও সার্বিক বিষয়ে পুলিশ বলছে, পূর্ব শক্রতা বা দ্বন্দ্বের জের ধরে হয়তোবা এই হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটতে পারে। ঘটনাস্থল থেকে ৩ টি গুলির খোসা অন্যান্য আলামত উদ্ধারসহ বিভিন্ন বিষয়কে সামনে রেখে তদন্তের কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং হত্যাকা-ে জড়িতদের গ্রেপ্তারে জোরদার প্রচেষ্টা অব্যহত রয়েছে। প্রাথমিক সুরতহাল, ময়নাতদন্ত শেষে শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) দুপুরে নিহতের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এদিকে, শুক্রবার দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে নিহত সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলনের লাশ নিজ বাড়ীতে এসে পৌছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। গ্রামবাসী, পরিবারের সদস্য, স্বজনদের আহাজারি ও আর্তনাতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। একই দিন মাগরিবের নামাজের পর আড়ংঘাটা শানতলা এলাকার জামে মসজিদে জানাযা নামায শেষে শানতলা কবরখানায় নিহতের দাফন সম্পন্ন হয়।
নিহত সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলনের পরিবারের দাবি, নির্ভীক সাংবাদিকতা ও প্রশাসনের দায়িত্বের ব্যর্থতার কারনেই সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যে গুলি মরতে হলো ইমদাদুলকে। কারন পূর্বে কয়েকবার তার উপর হামলা ও মারপিটের ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেনি। মামলার পরও পুলিশ-প্রশাসন কোনো আসামীকে আইনের আওতায় আনেনি। তাছাড়া নিহত মিলনকে প্রায় হত্যার হুমকি দেওয়া হতো বলেও তাদের অভিযোগ রয়েছে। নিহত সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন এক সময়ে দৈনিক প্রবাহ পত্রিকার আড়ংঘাটা প্রতিনিধি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি সর্বশেষ একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালেও নিয়মিত সাংবাদিকতার কাজ করছিলেন। একই সাথে তিনি আড়ংঘাটা প্রেস ক্লাবের সাঃ সম্পাদক ও শূলয়া বাজার কমিটির একটি পদের দায়িত্বও ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) রাত ৯ টার দিকে নিহত সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন আড়ংঘাটা থানাধীন শলূয়া বাজার এলাকার একটি দোকানের মধ্যে বসে কথা বলছিলেন। ওই সময় মটরসাইকেল যোগে একদল শসস্ত্র সস্ত্রাসীরা এসে তার মাথা লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। ওই ঘটনাস্থলে এক গ্রাম্য পশু চিকিৎসকও গুলিবিদ্ধ হন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে খুমেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলনকে মৃত বলে ঘোষনা করেন। শলূয়া এলাকায় প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের এমন গুলিবর্ষন ও খুনের ঘটনায় গোটা এলাকাবাসী শঙ্কিত ও আতঙ্কগ্রস্থ বলে সূত্রে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কালীতলা এলাকার এক বাসিন্দা জানান, পূর্বে কয়েকবার ইমদাদুলের উপর হামলা চালায় দুর্র্বৃত্তরা। মিলনের পরিবার মামলাও করে, তারপরও পুলিশ ওই ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, আসামী ধরেনি। পুলিশ যদি ওই সময়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করতো, তবে ইমদাদুল হয়নো আজ খুন হতো না, তার বাচ্চারা এতিম হতো না।
নিহত সাংবাদিক ইমদাদুলের বড় ছেলে জানায়, আমার বাবার উপর, তার অফিসের (আড়ংঘাটা প্রেসক্লাব) মধ্যে পূর্বে কয়েকবার হামলা চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ওই সময় ব্যবস্থা নিলে আমরা পিতৃহারা হতাম না। আমি আমার বাবার হত্যার বিচার চাই, খুনিদের দেখতে চাই, সর্ব্বোচ শাস্তি চাই।
নিহত সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলনের ছোট ভাই জানান, প্রশাসনের কাঝে কোনো কিছু বললে তারা কোনো সমাধান দিতে পারে না। এর আগেও আমার ভাইরের উপর কয়েকবার হামলা ও মারপিট করা হয়েছে। আমরা মামলা করেছি, পুলিশ কি কোনো আসামীকে গ্রেপ্তার করতে পেরেছে। পরে হুমকিতে মামলা তুলেও নেওয়া লেগেছে। বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও নির্ভীক সাংবাদিকতা করতে গিয়ে আমার ভাই খুন হলো। কার কাছে বিচার দিবো, বাজারের উপর প্রকাশ্যে গুলি করে চলে যাচ্ছে, কোনো বিচার নেই, কোনো গ্রেপ্তার নেই। সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে আজ আমার ভাই খুন হলো। বিচার চেয়ে কি আমরা বিচার পাবো? প্রশাসন কি এই সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করতে পারবে?
নিহত সাংবাদিক ইমদাদুলের স্ত্রী জানান, খুনিরা আমার তিনটি বাচ্চাকে এতিম করে দিলো। আমরা একটা বাচ্চা প্রতিবন্ধী। কে এখন আমার এই সন্তানদের দায়িত্ব নেবে। আমি কার কাছে আমার স্বামীর হত্যার বিচার দেব। প্রকৃত বিচার কি পাবো? প্রকৃত খুনিরা কি ধরা পড়বে? আমি আমার স্বামীর হত্যার বিচার চায়, খুনিদের সর্ব্বোচ শাস্তি চাই।
এ বিষয়ে দৌলতপুর আড়ংঘাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি জিএম মাসুদুল হক মাসুম জানান, প্রথমে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। পাশাপাশি তিনি আরো জানান, প্রশাসনতো ঢিলেঢালা চলছে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা কোথায়? দ্রুত এ খুনের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে সু-শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র মহানগর সাঃ সম্পাদক এড.কুদরত-ই খুদা জানান, খুলনা বর্তমানে সন্ত্রাসের রাজত্বে পরিনত হয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, গ্রুপিং, মাদক সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজিসহ বিবিধ বিষয়ে সামনে রেখে প্রতিদিনই মানুষ খুন হচ্ছে। জনমতে আতঙ্ক সৃষ্টির পায়তারার জন্যই গতকাল দৌলতপুরের গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটতে পারে। সত্যকার অর্থে বর্তমানে পুলিশের ভূমিকা অকার্যকর ও নিরব। সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধে পুলিশের ভূমিকা ছাড়া এটি প্রতিরোধ অসম্ভব।
এ বিষয়ে দৌলতপুর থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহাজাহান আহম্মেদ জানান, সাংবাদিক হত্যাকা-ের বিভিন্ন আলামত ও বিষয়কে সামনে রেখে তদন্তের কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং হত্যাকা-ে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। ওই খুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ওই ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। আশাবাদি দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামী গ্রেপ্তারে সক্ষম হবো।
এ বিষয়ে কেএমপির উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) সুদর্শন কুমার রায় জানান, পূর্ব শক্রতার জের ধরে এই খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে দুর্বৃত্তরা। ঘটনাস্থল হতে ৩ টি গুলির খোসা, অন্যান্য আলামত উদ্ধারসহ বিভিন্ন বিষয়কে সামনে রেখে তদন্তের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জড়িতদের আটকে আমাদের টিম কাজ করছে।
এ বিষয়ে কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন) মোহাম্মাদ রশিদুল ইসলাম খান জানান, খুলনার প্রতিটি খুনের ঘটনার রহস্য উৎঘটন ও আসামী গ্রেপ্তারে আমরা নিরলস কাজ করছি। আড়ংঘাটা এলাকায় খুনের ঘটনার ব্যাপারে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা জড়িত আসামীদের গ্রেপ্তার ও খুনের রহস্য উৎঘটনের কাজ করছে। আশাবাদি দ্রুত সময়ের মধ্যে আসামীরা ধরা পড়বে।

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button