এনইআইআর: সুরক্ষা নাকি নতুন অনিশ্চয়তা

অবৈধ ও নকল হ্যান্ডসেট নিয়ন্ত্রণ এবং নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্য নিয়ে দেশে চালু হয়েছে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) কার্যক্রম। সরকারের মতে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে চোরাই ও পুনঃপ্রোগ্রাম করা ডিভাইস শনাক্ত হবে, আর্থিক জালিয়াতি কমবে, এবং বাজারে শৃঙ্খলা আসবে। কিন্তু কার্যক্রম শুরুর পরপরই যে পরিমাণ ত্রুটি, বিভ্রান্তি ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট উদ্বেগ সামনে এসেছে-তা উদ্যোগটির বাস্তবায়ন প্রস্তুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, বিভিন্ন ব্যবহারকারীর অভিযোগ, এক ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে কয়েক ডজন থেকে ৬০-৮০টির বেশি মোবাইল ফোনের নিবন্ধন দেখাচ্ছে, যেগুলোর কোনোটি তার নিজের নয়। অনেকেই জানিয়েছেন, তাঁদের ব্যবহৃত ও বৈধ ডিভাইসের আইএমইআই তালিকায় নেই; বরং অজানা ডিভাইসই সেখানে দেখা যাচ্ছে। কিছু ব্যবহারকারী দাবি করেছেন-ভুলভাবে যেকোনো সিরিজ নম্বর প্রবেশ করালেও ব্যক্তিগত তথ্য প্রদর্শিত হচ্ছে, যা তথ্য সুরক্ষা ও গোপনীয়তার ঝুঁকি তৈরি করছে। একই সঙ্গে সার্ভারে প্রবেশ ব্যর্থতা ও প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে সাধারণ ব্যবহারকারী ভোগান্তিতে পড়ছেন। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব সিস্টেমের ত্রুটি স্বীকার করে জানিয়েছেন-অপারেটরদের বিপুল ‘হিস্টোরিক ডেটা’ মাইগ্রেশনের কারণে অনেকের এনআইডিতে অতিরিক্ত ডিভাইস দেখাচ্ছে, যা পর্যায়ক্রমে আর্কাইভ করা হবে। দায় স্বীকার ও ব্যাখ্যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক; তবে যেহেতু এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা ও তথ্যভিত্তিক অবকাঠামো, তাই কেবল পরবর্তী সময়ে সমাধানের আশ^াস-জনআস্থার সংকট কাটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণে কোটি কোটি ডুপ্লিকেট ও পুনঃপ্রোগ্রাম করা আইএমইআইয়ের অস্তিত্ব যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা দেশের ডিভাইস বাজারে নকল ও অনিবন্ধিত হ্যান্ডসেটের দীর্ঘস্থায়ী বিস্তার প্রমাণ করে। ডিজিটাল জালিয়াতি ও আর্থিক অপরাধে এসব ডিভাইস ব্যবহারের যে পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়েছে-তা সমস্যার অন্তর্নিহিত গুরুত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে বৃহৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার এই উদ্যোগ কার্যকর হতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা যাচাই, পরীক্ষামূলক রান এবং ব্যবহারবান্ধব সাপোর্ট ব্যবস্থা আগে থেকেই নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। বিশেষজ্ঞদের মত অনুযায়ী-পূর্ণ প্রস্তুতি ব্যতীত একটি সংবেদনশীল প্ল্যাটফর্ম চালু করা নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ও আস্থাকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়। এই মুহূর্তে প্রয়োজন-স্বচ্ছ তদন্ত, কারিগরি ত্রুটির দ্রুত সমাধান, তথ্য সুরক্ষার নিশ্চয়তা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য স্পষ্ট অভিযোগ-নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া। প্রয়োজনে স্বাধীন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে সিস্টেম অডিট করা যেতে পারে। অবৈধ ডিভাইস নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য যেমন সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়, তেমনি তা বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে নাগরিকের গোপনীয়তা, নিরাপত্তা ও আস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়াই হওয়া উচিত। অন্যথায় সুফলের বদলে এনইআইআর নতুন অনিশ্চয়তার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
