শাহজালাল ইক্যুইটির নিবন্ধন বাতিলে অধিকতর তদন্ত শুরু

# একমি প্রেস্টিসাইডসের আইপিও জালিয়াতি #
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্টের নিবন্ধন বাতিলের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে আরও অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে পুঁজিবাজারে কোম্পানি তালিকাভূক্তির ক্ষেত্রে ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে যথাযথ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা এবং প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রসপেক্টাসে মিথ্যা তথ্য দাখিলের অভিযোগ রয়েছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে সেই অভিযোগ প্রমাণিতও হয়েছে। জানা গেছে, শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট একমি পেস্টিসাইডস লিমিটেডের আইপিও’র ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। বিএসইসির তদন্তে প্রমাণ পাওয়া যায়, একমি পেস্টিসাইডস প্রি-আইপিও প্লেসমেন্টে টাকা ছাড়াই শেয়ার বরাদ্দ, হিসাব কারসাজি ও প্রসপেক্টাসে অসংখ্য মিথ্যা তথ্য দিয়েছে। এসব অনিয়ম যাচাইয়ের দায়িত্ব ছিল ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট জালিয়াতিপূর্ণ প্রসপেক্টাসকে অনুমোদন দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির রেজিস্ট্রেশন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এই পদক্ষেপটি আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) প্রক্রিয়ায়, বিশেষ করে তথ্য প্রকাশের মানদ-ের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিএসইসির কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিএসইসি জানিয়েছে, তদন্তের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে মার্চেন্ট ব্যাংকটির নিবন্ধন সনদ বাতিল করার জন্য তারা নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারপরও আরও তথ্য উদঘাটনের জন্য আরও অধিকতর তদন্তে নেমেছে বিএসইসি। সম্প্রতি এক আদেশ জারির তারিখ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সিকিউরিটিজ কমিশন মার্চেন্ট ব্যাংকটির লাইসেন্স বাতিল করতে পারে বলে জানা গেছে। বিএসইসি সূত্রে জানা যায়, একমি পেস্টিসাইডস জালিয়াতিপূর্ণ আর্থিক বিবরণী ব্যবহার করে জনগণের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কমিশন কর্তৃক গঠিত একটি তদন্ত কমিটি এসব তথ্য জানতে পারে। তদন্তে দেখা যায়, একমি পেস্টিসাইডস শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে কোনো অর্থ না নিয়েই প্লেসমেন্ট শেয়ারগুলো ইস্যু করে। কিন্তু কোম্পানিটি তার আর্থিক বিবরণীতে প্লেসমেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে সংগৃহীত তহবিল দেখিয়েছে। ব্যাংক রেকর্ডেও টাকার অঙ্কগুলো সমন্বয় করেছে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে শেয়ারহোল্ডাররা টাকা না দিলে কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে সমন্বয় করা তহবিল কোথা থেকে এলো। আইপিও নথিপত্রে গুরুতর এই জালিয়াতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (লিস্টিং) রেগুলেশন, ২০১৫ এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-সহ সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজ আইনের লঙ্ঘন। এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রাপ্ত তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠিয়েছে বিএসইসি। তাতে বলা হয়েছে, একমি পেস্টিসাইডসের শীর্ষ কর্তাদের কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার কোনো টাকা পরিশোধ না করেই কোম্পানির প্লেসমেন্ট শেয়ার গ্রহণ করেছেন। এছাড়া একমি পেস্টিসাইডস বিতর্কিত রাজস্ব কর্মকর্তা ছাগল-কান্ডের মতিউর রহমানসহ বিভিন্ন কোম্পানি ও ব্যক্তির কাছেও প্লেসমেন্ট শেয়ার ইস্যু করেছিল। জানা গেছে, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা-উর-রহমান সিনহা একটি শুনানিতে বলেছেন, শীর্ষ কর্মকর্তারা জোরপূর্বক কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য হস্তগত করেছেন এবং প্লেসমেন্ট শেয়ার থেকে ভুয়া অর্থপ্রবাহ দেখানোর জন্য স্টেটমেন্টে কারচুপি করেছেন। এসব নিয়ে দুদক তাদের অনুসন্ধান শুরু করেছে। এদের মধ্যে রয়েছেন একমি পেস্টিসাইডসের চেয়ারম্যান শান্তা সিনহা, পরিচালক আহসান হাবিব সিনহা ও কেএম হেলুয়ার, সিএফও সেলিম রেজা এবং কোম্পানি সচিব সবুজ কুমার ঘোষ। পর্যবেক্ষণাধীন প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছেন মো. আফজাল হোসেন, এসকে ট্রিম অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, সাবেক এনবিআর সদস্য মতিউর রহমান, বিক্রমপুর পটেটো ফ্লেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, তাফাজ্জাল হোসেন ফরহাদ, জাভেদ এ মতিন, বেঙ্গল অ্যাসেটস হোল্ডিংস, চট্টগ্রাম পেস্টিসাইডস অ্যান্ড ফিশারিজ, হেরিটেজ ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট, এনআরবি ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট, অঞ্জোমান আরা বেগম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেখ মোহাম্মদ সারওয়ার, তৌহিদা আক্তার, মো. রুহুল আজাদ এবং রানু ইসলাম। কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা তুলে ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় নিরীক্ষক সিরাজ খান বসাক অ্যান্ড কোং-এর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএসইসি। এছাড়া পুঁজিবাজারের বৃহত্তর স্বার্থে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষার জন্য শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের নিবন্ধন সনদ বাতিলে প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিএসইসির তিন কর্মকর্তাকে দ্বায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এরা হলেন, বিএসইসির অতিরিক্ত পরিচালক শামসুর রহমান, উপপরিচালক শাহনেওয়াজ এবং সহকারী পরিচালক আতিকুল্লাহ খান। তদন্ত কমিটির সার্বিক তত্ত্বাবধানের দ্বায়িত্বে রয়েছেন বিএসইসির পরিচালক মো. আবুল কালাম। বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম বাংলানিউজকে বলেন, ‘শাহজালাল ইক্যুইটির নিবন্ধন সনদ বাতিলের যৌক্তিকতা আছে কিনা এই বিষয়ে তদন্ত কমিটি হয়েছে। কমিটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইনগত বিধি-বিধান অনুসরণ করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে এই বিষয়ে একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত আছে উল্লেখ করে আবুল কালাম বলেন, কমিটি বাড়তি সময় চাইলে নিতে পারবে। এখনে কোন বাধ্য বাধকতা নেই। জানা গেছে, গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর কমিশনের ৯৭৩তম সভায় শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিএসইসি। এবারের তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ প্রাপ্য ও প্রদেয়, সম্পদ ও দায় এবং অন্য কোনো আইনগত ঘাটতি খতিয়ে দেখা হবে। শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট ডোমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস এবং এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডেরও ইস্যু ম্যানেজার ছিল। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ দেখতে পায়, ডমিনেজ স্টিলের একটি কারখানা বেশ কয়েক মাস ধরে বন্ধ ছিল। এর ফলে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্পনসর, পরিচালক এবং প্লেসমেন্ট হোল্ডারদের হাতে থাকা শেয়ারের লক-ইন মেয়াদ কমপক্ষে তিন বছর বাড়িয়েছে। ‘অবাস্তব’ মূল্য-সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশের পর শেয়ারহোল্ডারদের চড়া দামে শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার আশঙ্কায় এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, শাহজালাল ইক্যুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড ইউনুস গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের একটি প্রতিষ্ঠান। এই গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ ইউনুস পুঁজিবাজারে নানা অনিয়মের অভিযোগে অভিযুক্ত। তার মালিকানাধীন সোনালী পেপারের শেয়ার নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে।



