খেলাধুলা

সেই চট্টগ্রামে শান্তর স্বস্তির শতক

# ২৫ মাস আর ২০ ইনিংস পর সেঞ্চুরি #

প্রবাহ স্পোর্টস ডেস্ক ঃ জেডেন লেনক্সের ডেলিভারিটি লং অনে ঠেলে ধীর লয়ে দৌড়ে এক রান নিয়ে ৯৯ থেকে সেঞ্চুরিতে পৌঁছালেন নাজমুল হোসেন শান্ত। ক্রিজের সাদা দাগটা ছুয়ে তাকালেন আকাশের দিক, হেলমেট খুললেন, সেঞ্চুরি করলে তার চিরচেনা উদযাপন ব্যাটে চুমু খেয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া- শান্ত তা-ও করেছেন। তবে ছিল না রানওয়ে থেকে উড়াল দেওয়া উড়োজাহাজের মতো লাফিয়ে ওঠা। উল্টো সবকিছুতেই ছিল একটা ধীর লয়, দীর্ঘ একটা অপেক্ষা শেষ হওয়ার স্বস্তিও। সেই স্বস্তির ক্ষণটির সাক্ষী হিসেবে থাকা তাওহীদ হৃদয়ের কাছে নিশ্চিত হয়ে পশ্চিম দিকে ফিরে সৃষ্টিকর্তার শুকরিয়া আদায়ে লুটিয়ে পড়লেন সেজদায়। উঠে করলেন মোনাজাতও। যে উইকেটে ঠিক ২৫ মাস আর ২০ ইনিংস আগে পেয়েছিলেন তিন অঙ্কের দেখা সেই সাগরিকাতেই খরা কাটানোর পর এর চেয়ে ভালো উদযাপন আর কী-ই বা হতে পারতো! ২০২৪ সালের মার্চে এই মাঠেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ছিল তার সর্বশেষ ওয়ানডে সেঞ্চুরি। এবার একই মাঠে তৃতীয় বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পেলেন শতকের দেখা। চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সমতায় থাকা সিরিজে গতকালের ম্যাচটা ছিল একরকম ফাইনালই। মিরপুরের শেরেবাংলা সিরিজের প্রথম ম্যাচে ২৬ রানে হারের পর দ্বিতীয়টিতেই ৬ উইকেটে জিতে ঘুরে দাঁড়ানো। বাংলাদেশের জন্য সিরিজ জয়টা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ আটে থেকে বিশ্বকাপ খেলার চ্যালেঞ্জের কারণে। অথচ এমন ম্যাচেই কিনা ৩২ রানেই নেই বাংলাদেশের ৩ উইকেট! সেখান থেকে যেভাবে ইনিংসটা গড়ে তোলার দরকার, শান্ত করেছেন তা-ই। ইনিংসটি গড়ে তুলেছেন- শান্ত, ধীর, স্থির লয়ে। চতুর্থ উইকেটে লিটন দাসের সঙ্গে জুটি বেঁধে ইনিংসটা টেনেছেন তিনিই। শান্ত এদিন প্রথম পঞ্চাশ রান করতেই যেমন নিয়েছেন ৭০ বল। তখনো সুযোগমতো বাউন্ডারি আর বাকি সময়ে ভর করেছিলেন সিঙ্গেলস আর ডাবলসের ওপর। সুযোগমতো ব্যাটও চালিয়েছেন। পরের পঞ্চাশ রান করতে তার লেগেছে ৪৪ বল। এই প্রচ- গরমে ততক্ষণে ১৭৭ মিনিট ব্যাট করে ফেলেছেন। খ্যাপাটে উদযাপনের প্রাণশক্তি হয়তো তার ছিল না। এমনকি সেঞ্চুরির পর যে হেলমেট খুললেন, ব্যাট তুললেন, উড়ন্ত চুমু এঁকে দিলেন, সবকিছুতেই ছিল ক্লান্তির ছাপ। তার ইনিংসের মহিমাও তাতে বেড়ে যাচ্ছে আরও। ক্রিজে যখন গেলেন, ২.১ ওভারেই তখন ড্রেসিং রুমে ফিরে গেছেন দুই ওপেনার সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান। একটু পর সৌম্য সরকারকেও হারিয়ে টালমাটাল দল। দলের সিরিজ জয়ের আশাও তখন হাঁসফাঁস করছে। সেখান থেকেই তিনি হয়ে উঠলেন দলের ভরসা। পরিস্থিতির চাপকে আড়াল করলেন চওড়া ব্যাটে। লিটনকে নিয়ে গড়লেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৬০ রানের রেকর্ড জুটি (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ও চতুর্থ উইকেটে সর্বোচ্চ)। শুধু তো নিউজিল্যান্ডের বোলাররাই নয়, আবহাওয়াও ছিল প্রতিপক্ষ। যখন তিন অঙ্ক ছুঁলেন ঠিক সেই মুহূর্তে চট্টগ্রামের তাপমাত্রা ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরিয়ে। কিন্তু সব হাল না ছেড়ে, সবকিছুকে হারিয়ে ঠিকই তিনি পৌঁছে গেলেন শতরানে। তার চতুর্থ ওয়ানডে সেঞ্চুরি এটি। প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরির স্বাদ পেয়েছিলেন তিনি ২০২০ সালের ১ মার্চ। সেদিন থেকে এ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে ৪টি সেঞ্চুরিই সর্বোচ্চ। শান্তর পাশাপাশি যা করেছেন লিটনও। গত বছর হুট করে শান্তর কাছ থেকে বিতর্কিতভাবে কেড়ে নেওয়া হয় ওয়ানডে অধিনায়কত্ব। অধিনায়ক হিসেবে ওয়ানডেতে তার ব্যাটিং গড় ছিল ৫১.২৭। তবে নেতৃত্ব ছাড়ার পরই যেন ব্যাটের ছন্দটাও হারিয়ে ফেলেন নাজমুল। এই ম্যাচের আগে ওয়ানডেতে ১৪ ইনিংসে তার ফিফটি ছিল মাত্র একটি, ব্যাটিং গড়টাও নেমে এসেছিল ১৮.৭৬-তে। এ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছিল দলেরও। আগের ম্যাচে ফিফটি পাওয়ার পর তা কিছুটা কমেছিল। তবে সেদিন তাকে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল প্রচ- গরমের কারণে ক্র্যাম্প করায়। সেই শঙ্কা এ দিনও যে ছিল না, তা নয়। তবে এবার তিনি কন্ডিশনের কাছে হার মানেননি। বরং জয় করেছেন প্রতিকূলতা। ফিফটির পর আবির্ভুত হন সেরা ছন্দে। গোটা ইনিংসে সিঙ্গল নিয়েছেন ৪২টি। এটিও ফুটিয়ে তুলছে তার ফিটনেস। শেষ ম্যাচে দলের যা অবস্থা ছিল, তাতে শান্তর ব্যাট ¯্রফে ফিফটিই যথেষ্ট ছিল না। ৩২ রানে প্রথম ৩ ব্যাটারকে হারায় দল। রিশাদ হোসেন ও তাসকিন আহমেদ একাদশে না থাকায় এই ম্যাচে দলের ব্যাটিংয়ের লেজ অনেক লম্বা। সাত নম্বরের পর ব্যাটসম্যানই নেই বলতে গেলে। শান্তর ব্যাটে একটি বড় ইনিংস তাই জরুরি ছিল। প্রয়োজন ছিল কেজন সঙ্গীরও। সেখান হাত বাড়িয়ে দিলেন লিটন। দুজনে মিলে এগিয়ে নিলেন দলকে। অপরপ্রান্তে ঠা-া মাথার ব্যাটিংয়ে ১৯ ইনিংসের খরা কাটিয়ে লিটন ফিফটি করেন ৭১ বলে। ৯১ বলে ৭৬ রান করে লিটন বোল্ড হন লেনক্সের বলে। শান্ত তখন খেলছেন ৯২ রানে। সঙ্গীকে হারালেও তিনি মনোবল হারাননি। একটু পরই পৌঁছে যান শতরানে। শতরানের একটু পর ছক্কার চেষ্টায় সীমানায় ধরা পড়ে শেষ হয় তার ইনিংস। ১৮৬ মিনিটের নায়োকোচিত লড়াই শেষে তিনি মাঠ ছাড়েন মাথা উঁচু করে। শুরুর সেই অস্বস্তি কাটিয়ে দল তখন স্বস্তির ঠিকানায়। শেষ দিকে দ্রুত রান তুলতে না পারায় যদিও খুব একটা বড় হয়নি স্কোর। শান্তর বিদায়ের পর শেষ ৭ ওভারে বাংলাদেশ তুলেছে ¯্রফে ৪৪ রান। হৃদয় (২৯ বলে ৩৩*) আর অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজের ব্যাটে (১৮ বলে ২২) ৮ উইকেট হারানো বাংলাদেশের ঝুলিতে জমে ২৬৮। তাতেই পরে বোলারদের সৌজন্যে বাংলাদেশ হাসে সিরিজ জয়ের হাসি।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button