‘এই চেয়ারে বসলে মনে হয় আগুনের তপ্ত হিট আসছে’

নিজের চেয়ার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য
প্রবাহ রিপোর্ট : জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী দিনে দেওয়া এক আবেগঘন ও নীতিনির্ধারণী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, সরকার প্রধানের এই চেয়ারটি দূর থেকে দেখতে খুব আরামদায়ক মনে হলেও আসলে এটি মোটেও আরামের নয়।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শেষ দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সমাপনী বক্তব্য দেন তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী নিজের চেয়ারের বিষয়ে ব্যক্তিগত অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, এই চেয়ারটি খুব কঠিন একটি জায়গা। এই চেয়ারে বসলে আমি প্রতি মুহূর্তে অনুভব করি যে আগুনের তপ্ত হিট বা তাপ আসছে। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে সংসদ বা জনসভায় অনেক জনপ্রিয় বা ‘পপুলার’ কথা বলে হাততালি কুড়ানোর সুযোগ থাকলেও এই দায়িত্বের চেয়ার তাকে সেই অনুমতি দেয় না। এই চেয়ার প্রতি মুহূর্তে তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তাকে জনপ্রিয় সিদ্ধান্তের চেয়ে সঠিক বা রাইট ডিসিশনটি নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের প্রত্যাশা মেটানো এবং সমস্যা সমাধানের গুরুভার এই চেয়ারের উত্তাপ বাড়িয়ে দেয়। আমরা যদি পপুলার ডিসিশনের পেছনে ছুটি, তবে হয়তো বাহবা পাব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সেজন্যই সংসদ সদস্য ও বিরোধী দলের বন্ধুদের প্রতি পপুলার নয় বরং সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর আলাপ করার আহ্বান জানাই।
তারেক রহমান দেশের কৃষি ও পরিবেশগত সংকটের কথা উল্লেখ করে বলেন, জলাবদ্ধতা এবং পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার সমস্যাটি অত্যন্ত ভয়াবহ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচি পুনরায় শুরুর লক্ষ্যই হলো মাটির নিচের পানির স্তর রিফিল করা। এই কাজের শুভফল পেতে প্রায় ২০ বছর সময় লাগবে, তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভেবে এখনই আমাদের তপ্ত আগামীর প্রস্তুতি নিতে হবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে মোট বাজেটের প্রায় ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে রাখার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা বাস্তবায়নে কাজ করছি। প্রাইমারি স্কুলের শিশুদের ব্যাগ, বই ও জুতো দিয়ে উৎসাহিত করার পাশাপাশি শিক্ষকদের সম্মান বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে তারা গুণগত শিক্ষায় মনোনিবেশ করতে পারেন। শুধু হাসপাতালের ভবন থাকলে হবে না, সেখানে ডাক্তার, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং ওষুধের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
বিরোধী দলীয় নেতার উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং গন্তব্য এক, আর তা হলো বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি স্বনির্ভর ও নিরাপদ দেশ গড়ে তোলা।
সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, অতীতে যতবারই গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে, ততবারই দেশের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান মুখ থুবড়ে পড়েছে। তিনি ১৭৩ দিনের হরতালের স্মৃতিচারণ করে বলেন, সেই সময় হয়তো কোনো সরকার ক্ষমতা হারিয়েছে কিন্তু বুক চিরে কেউ বলতে পারবে না যে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সেই ক্ষতির মাসুল আজও আমাদের টানতে হচ্ছে।
বর্তমানে ৩০ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করার চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি স্থিতিশীল সরকার ও সংসদ নিশ্চিত করতে না পারলে আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব না। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিরোধী দলের প্রতি অত্যন্ত উদার মনোভাব পোষণ করে জানান, ডেপুটি স্পিকার পদটি তাদের জন্য দেওয়ার প্রস্তাব এখনো উন্মুক্ত রয়েছে এবং তিনি নিজে বিরোধী দলীয় নেতার বাসায় গিয়ে সহযোগিতা চেয়ে এসেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান এবং কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, আমাদের মূল্যবান ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ডিবেট দিয়ে কোনো ক্ষুধার্ত মানুষের পেট ভরবে না কিংবা অসুস্থ শিশুর মায়ের মন শান্ত হবে না। মানুষ এখন ডিবেট নয়, তাদের সমস্যার সমাধান চায়।



