জাতীয় সংবাদ

ইরানে ফের যুদ্ধের দামামা

প্রশিক্ষণ নিচ্ছে সাধারণ নাগরিকরা
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের নতুন প্রস্তাব

প্রবাহ ডেস্ক : তেহরানের হাফতে তির স্কয়ারের একটি বুথ। ভেতরে সামরিক পোশাক পরা এক ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্রের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বর্ণনা দিচ্ছেন। সামনে বসে তা শুনছেন নারী, পুরুষ এমনকি কিশোররা। সোমবার (১৮ মে) হাফতে তির স্কয়ারের এমন আরো কয়েকটি ছবি প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। একটিতে দেখা যাচ্ছে, বুথে নারীদের অস্ত্র চালানোর বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন সামরিক বাহিনীর আরেক প্রতিনিধি। বার্তা সংস্থাটি বলছে, দেশটিতে ফের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার উদ্বেগ বাড়ায় এমন প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।
হাফতে তির স্কয়ারের প্রকাশিত ছবিগুলো রবিবারের। একইদিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে নতুন সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘দ্রুত শান্তি চুক্তি না করলে দেশটির আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’ ট্রাম্পের এমন হুমকির দিনেই তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। এতে সরকারপন্থী কয়েক’শ নারী-পুরুষ অংশ নেন। তাদের হাতে ছিল প্রয়াত নেতা আলি খামেনি ও বর্তমান নেতা মোজতবা খামেনির ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএনও সোমবার ইরানিদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তেহরানের অভিজাত এলাকা তাজরিশ স্কয়ারের মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন তিয়ানা নামের এক তরুণী। তিনি বলেন, ‘আমি আমার দেশ ও মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে পুরোপুরি প্রস্তুত।’
ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন হুমকিকে গুরুত্ব না দিয়ে তিয়ানা বলেন, ‘আমাদের সব মানুষ, পুরো সেনাবাহিনী এবং যত কমান্ডার আছেন, সবাই জীবন দিতে প্রস্তুত।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় ইরানজুড়ে সরকারপন্থী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের বুথ দেখা যাচ্ছে। সেখানে সাধারণ নাগরিকদের অস্ত্র ব্যবহারের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
ভানক স্কয়ারের এমন একটি বুথে সিএনএনের সাংবাদিকরা দেখেন, কালো চাদর গায়ে জড়ানো এক নারী একে-৪৭ অ্যাসাল্ট রাইফেল চালানোর নিয়ম শিখছেন। সামরিক পোশাক পরা এক মুখোশধারী ব্যক্তি তাঁকে অস্ত্রটি খোলা ও ফের জোড়া দেওয়ার পদ্ধতি দেখিয়ে দিচ্ছেন।
ভানক স্কয়ারের এই বুথের কয়েক ফুট দূরে এক শিশুকে গুলিবিহীন একে-৪৭ রাইফেল হাতে দেখা যায়। সে অস্ত্রটি আকাশের দিকে তাক করে ট্রিগারে চাপ দেয়। অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার এই সর্বজনীন আহ্বান ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও বারবার প্রচার করা হচ্ছে। বেশ কয়েকটি চ্যানেলের উপস্থাপকদেরও রাইফেল প্রদর্শন করতে দেখা গেছে।
রাষ্ট্র মালিকানাধীন অফোঘ চ্যানেলের উপস্থাপক হোসেইন হোসেইনি সরাসরি সম্প্রচারিত এক অনুষ্ঠানে স্টুডিওর ছাদ লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। পরে জানান, আইআরজিসির সদস্যের কাছে থেকে তিনি অস্ত্র ব্যবহারের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। চ্যানেল-৩-এর উপস্থাপক মবিনা নাসিরিকেও রাইফেল হাতে দর্শকদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে।
তবে সব ইরানিই যে যুদ্ধের পক্ষে, তেমনটা নয়। তাজরিশ স্কয়ারের পাশের একটি পার্কে এক নারীর সঙ্গে কথা বলেছেন সিএনএনের সাংবাদিকরা। ওই নারী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। নিরাপত্তার স্বার্থে নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি। তিনি বলেন, ‘আমরা কেবল একটি স্বাভাবিক দেশে বাঁচতে চাই। যেখানে আমাদের সন্তানদের একটি ভবিষ্যৎ থাকবে।’
‘ইরানে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হামলা শুরু করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র’ : ইরানে যুক্তরাষ্ট্র আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হামলা চালাতে পারে বলে জানিয়েছেন কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট অব গ্র্যাজুয়েট স্টাডিসের মিডিয়া স্টাডিসের প্রফেরস মোহাম্মদ এলমাসরি।
সোমবার (১৮ মে) সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে তিনি বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র আবারও যুদ্ধ শুরু করবে কারণ ট্রাম্পের কানের কাছে রয়েছেন অনেক মানুষ। যারা তাকে বিভিন্ন কথা বলছেন। এরমধ্যে আছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং ট্রাম্প সরকারের মধ্যে থাকা কট্টরপন্থিরা।”
তিনি আরও বলেছেন, “ইরানের কাছ থেকে ট্রাম্প যে ধরনের আত্মসমর্পণ চেয়েছিলেন তিনি সেটি পাননি। এছাড়া ইরানিদের কাছ থেকে তিনি যা প্রত্যাশা করেছিলেন তাও পাননি। এছাড়া ট্রাম্প আশা করেছিলেন ইরানের সঙ্গে তাদের আলোচনা ভিন্নভাবে হবে। এরসঙ্গে চীন সফরে এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের সময়ও তিনি ইরান নিয়ে উচ্চ আশা করেছিলেন।”
দোহাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের এ প্রফেসর আরও বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ইরান যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য সত্যিকার একটি বিপর্যয়। যদি তিনি বিজ্ঞ হন তাহলে যুদ্ধ তার এখানেই শেষ করা উচিত। কিন্তু তিনি তা করবেন না। ট্রাম্প বর্তমান অবস্থা থেকে পিছিয়ে দেশের নাগরিকদের কাছে যুদ্ধ জয়ের ঘোষণা নিয়ে যেতে পারবেন না।”
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও দখলদার ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা চালায়। এরপর তাদের মধ্যে টানা ৪০দিন যুদ্ধ হয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি হলে এখন পর্যন্ত সংঘাত আর শুরু হয়নি। সূত্র : আলজাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের নতুন প্রস্তাব : যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠানো ইরানের সংশোধিত প্রস্তাবটি ফাঁস হয়েছে। যা সংগ্রহ করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়া। সোমবার (১৮ মে) তারা কয়েকটি প্রস্তাব প্রকাশ করেছে।
আল-আরাবিয়া জানিয়েছে, ফাঁস হওয়া প্রস্তাবে দেখা গেছে ইরান শর্তসাপেক্ষে তাদের সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম রাশিয়ায় পাঠাতে রাজি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, ইরানের ইউরেনিয়াম তাদের কাছে নিয়ে আসা হবে। তবে তেহরান জানিয়েছে, সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্র নয়, রাশিয়ার কাছে পাঠানো হবে। কিন্তু এতে থাকবে শর্ত। এছাড়া ইরান প্রস্তাব দিয়েছে তারা লম্বা একটি সময়ের জন্য তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখবে। কিন্তু স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধ করবে না।
যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরানকে তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি বাদ দিতে হবে।
সংশোধিত প্রস্তাবে ইরান আরও বলেছে তারা যুক্তরাষ্ট্রের থেকে কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ নেবে না। এর বদলে অর্থনৈতিক ছাড় চায়।
ইরানি আলোচকদের একটি কাছের সূত্রের বরাতে বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজ বলেছে, ইরান ১৪ দফার নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এই প্রস্তাবের প্রধান লক্ষ্য হলো যুদ্ধ বন্ধ করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বাস অর্জন করা।
বর্তমানে ইরানে অবস্থান করছেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কোনো ঘোষণা দিয়েই তিনি দেশটির রাজধানী তেহরানে যান। আজ তৃতীয়দিনের মতো তার সফরের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরমধ্যে জানা গেলো, ইরান মার্কিনিদের কাছে নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সূত্র: আল-আরাবিয়া

 

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button