খুমেকে ভয়াবহ অগ্নিকা- : নিহত ১ আহত ৫

# পরিদর্শনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী #
# ৫ সদস্য’র তদন্ত কমিটি গঠন
# আহতদের চিকিৎসা ব্যয় বহনের আশ্বাস,
# হাসপাতালের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় ক্ষোভ,
# হাজিরা খাতায় অনুপস্থিত ৭ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ
# আগুন আতঙ্কে নারী রোগীর মৃত্যু
কামরুল হোসেন মনি ঃ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (খুমেক)-এর বি ব্লকের তৃতীয় তলায় ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনায় বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াতহোসেন। এ সময় তিনি অগ্নিকা-ে আহতদের চিকিৎসা ব্যয় সরকার বহনের আশ্বাস দেন, হাসপাতালের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং অগ্নিকান্ডের ঘটনার তদন্তে ৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।
বুধবার দুপুর ১টার দিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী খুমেক হাসপাতালে পৌঁছে প্রথমে কার্ডিওলজি বিভাগ পরিদর্শন করেন এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। পরে তিনি অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্থ তৃতীয় তলার ইমার্জেন্সি ওটি, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড, স্টোররুম ও চিকিৎসকদের কক্ষ ঘুরে দেখেন। খুমেক হাসপাতালের স্বাস্থ্য মন্ত্রীর সাথে উপস্থিত ছিলেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, খুমেক হাসপাতালের পরিচালক ডা: কাজী মো: আইনুল ইসলাম, সদ্য যোগদান বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা: শেখ মো: মোসারফ হোসেন, হাসপাতালের তত্ত্ববধায়ক ডা: মো: আখতারুজ্জামান, খুলনা সিভিল সার্জন ডা: মোছা: মাহফুজা খানমসহ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকবৃন্দ, নার্স এবং কর্মকর্তা-কর্মচাইররা। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, “হাসপাতালের একটি বাথরুম দেখেছি, যা মানুষের ব্যবহারের অযোগ্য। আমি এর ছবি তুলে নিয়ে যাচ্ছি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সব বাথরুম পরিষ্কার করে ছবি পাঠাতে হবে।”তিনি আরও বলেন, “অগ্নিকা-ের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনরূদ্ধারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মন্ত্রী অভিযোগ করেন, “গত ১৭ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার স্বাস্থ্যখাতের দিকে নজর দেয়নি। ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে বাজেট বাড়ানো হয়েছে। ঈদের পর সারাদেশে ডাক্তার-নার্সসহ এক লাখ জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে খুলনাসহ পাঁচ বিভাগে শিশু হাসপাতাল চালু করা হবে।” তিনি জানান, দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন করে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তাদের অস্ত্র প্রদান করা হবে। হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে ^াস্থ্যমন্ত্র্রী শেষে খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতালে নির্মিত নতুন ভবন পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
হাজিরা খাতায় ৭ চিকিৎসক অনুপস্থিত ঃ
পরিদর্শনের একপর্যায়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসকদের হাজিরা খাতা পরীক্ষা করেন। সেখানে সাতজন চিকিৎসকের অনুপস্থিতি ধরা পড়ে। তারা হলেন ডা. তরিৎকান্তি ঘোষ, ডা. আসিফুল ইসলাম, ডা. হাসান আল বান্না, ডা. ফারিন ফাতিহ জাহান, ডা. এস এম কে লামিয়া, ডা. ইসরাত জাহান শিউলী ও ডা. তহিদা তাসনিম।
এ বিষয়ে হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হাসপাতাল পরিচালককে নির্দেশ দিয়েছেন।
রেবিস ভ্যাকসিন কিনতে বাধ্য রোগীরা, ক্ষুব্ধ মন্ত্রী ঃ এর আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী খুলনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে নানা অনিয়ম দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। রেবিস ভ্যাকসিন কর্নারে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, হাসপাতালে ভ্যাকসিন না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে।
এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম গাজীকে তিরস্কার করেন তিনি। এছাড়া রোগীদের জন্য রান্না করা নিম্নমানের কুমড়োর তরকারি দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করে উন্নতমানের খাবার সরবরাহের নির্দেশ দেন।
অগ্নিকা-ে আহত ৫ জন ঃ বুধবার ভোর ৬টার দিকে খুমেক হাসপাতালের চারতলা ভবনের তৃতীয় তলার স্টোররুমে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় হাসপাতালে। ঘটনায় পাঁচজন আহত হয়েছেন। তারা হলেন-হাসপাতালের স্টাফ সাইদুর রহমান (৫০), সিনিয়র স্টাফ নার্স নওরিন ইয়াসমিন, শারমীন আক্তার, রিপা বাইন এবং ফায়ার সার্ভিস সদস্য তৌহিদ।
হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত নার্সিং সুপারভাইজার হোসনে আরা খাতুন জানান, তিনতলা থেকে পড়ে গিয়ে নওরিন ইয়াসমিন ও শারমীন আক্তার গুরুতর আহত হন। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাড় ভেঙে গেছে। বর্তমানে তারা খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।তিনি বলেন, আহতদের চিকিৎসা ব্যয় সরকার বহন করবে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করতে বলেছেন।
তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি ঃ অগ্নিকা-ের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে খুমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। হাসপাতালের পরিচালক ডা. কাজী মো. আইনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে এ কমিটি গঠন করা হয়।কমিটির সভাপতি করা হয়েছে সহযোগী অধ্যাপক ডা. দিলিপ কুমার কুন্ডুকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সহযোগী অধ্যাপক ডা. জ্যোতির্ময় সাহা, সহকারী পরিচালক ডা. কাজী আহসান হাবিব এবং এইচইডি কর্মকর্তা এস এম মেহেদী। সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আখতারুজ্জামান।অফিস আদেশে বলা হয়েছে, অগ্নিকা-ে ক্ষতিগ্রস্তঅংশের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য ঃ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক সরকার মাসুদ আহমেদ জানান, ভোর ৬টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে বয়রা ফায়ার স্টেশন থেকে তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। পরে আরও সাতটি ইউনিট যোগ দেয়। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তিনি বলেন, “হাসপাতালের কয়েকটি গেটে তালা থাকায় ভেতরে প্রবেশে শুরুতে সমস্যা হয়। গেট ভেঙে ভেতরে ঢুকে প্রথমে বারান্দা থেকে চার থেকে পাঁচজনকে উদ্ধার করা হয়। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর আর কোনো হতাহতের ঘটনা পাওয়া যায়নি।”
হাসপাতালে আগুন আতঙ্কে নারী রোগীর মৃত্যু :
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বুধবার সকালে ইমারজেন্সি ওটিতে আগুন লাগার ঘটনায় নাসরিন নাহার নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আগুনের আতঙ্কে তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে আসার সময় অক্সিজেনের অভাবে তার মৃত্যু হয়। তিনি খুলনার কয়রা উপজেলার নেছার আলির মেয়ে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, জন্মগত ডায়াবেটিসের কারণে গত রোববার হাসপাতালে ভর্তি হন নাসরিন। বুধবার সকালে আগুনের আতঙ্কে তাড়াহুড়া করে নামার সময় মাক্স খুলে গেলে অক্সিজেনের অভাবে রোগী মারা যান বলে ধারণা করা হচ্ছে। হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের প্রধান ডা. দিলিপ কুমার কুন্ডু বলেন, নাসরিন নাহার নামে এক রোগী ভেন্টিলেশনে ছিলেন। সেখানে মোট ১৫ জন রোগী ছিল। আমরা সবাইকে নিরাপদে নিতে পেরেছি। কিন্তু ওই রোগীর স্বজনেরা নিজেরাই তাকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, রোগী নামিয়ে নিয়ে যাওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয়। তিনি আরও বলেন, আইসিইউতে ভর্তি রোগীরা সাধারণত মুমূর্ষু অবস্থায় থাকেন। তবে অগ্নিকা-ের ঘটনায় সরাসরি কেউ নিহত হননি।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. হোসেন আলী জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে শর্ট সার্কিট অথবা এসি বা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্তের পর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
খুমেক হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মী আনসার কমান্ডার এপিসি মো. আরিফুল ইসলাম জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণের সময় জানালার গ্রিল কাটতে গিয়ে গ্রিল ভেঙে পড়ে দুইজন স্টাফ নার্স ও ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য আহত হন। পরে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও আগুন লাগার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।



