চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে

# হামে সর্বোচ্চ মৃত্যু বাংলাদেশে #
আমরা আরো একটি বিশ্বরেকর্ড করেছি। তবে এটি কোনো কৃতিত্বের বিশ্বরেকর্ড নয়, এটি হলো নিকৃষ্টতম রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার কারণে হামে মৃত্যুর বিশ্বরেকর্ড। শত শত মা-বাবার বুকফাটা আর্তনাদের বিশ্বরেকর্ড। বিভিন্ন পত্র পত্রিকার প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, ২০২৬ সালে হামে মৃত্যুর সংখ্যায় বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত ৪৯৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একই সময়ে সুদানে মৃত্যু হয়েছে ৩৭১ জনের। এ ছাড়া পাকিস্তানে ৭১, মেক্সিকোতে ৩২, ইয়েমেনে ২৫, অ্যাঙ্গোলায় ১৫ এবং গুয়াতেমালায় ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশেও হাম সংক্রমণ রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে গত ২২ মে পর্যন্ত সব মিলিয়ে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬০ হাজার ৫৪০। এর আগে সর্বোচ্চ হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল ২০০৫ সালে, তখন আক্রান্ত ছিল ২৫ হাজার ৯৩৪ জন। এরপর টিকাদান কর্মসূচির কারণে সংক্রমণ অনেক কমে আসে। ২০২৫ সালেও দেশে মাত্র ১৩২ জন রোগী শনাক্ত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর দ্রুত ও সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাঁদের মতে, সময়মতো ব্যাপক টিকাদান, রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা নির্দেশিকা, অক্সিজেনসহ জরুরি সেবা নিশ্চিত করা গেলে অবস্থা এতটা খারাপ হতো না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় দেশে হামের নজরদারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে হামে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১৭ সালে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ১০ শিশুর মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে আরো ছয় শিশুর মৃত্যু হলেও তাদের নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি। সর্বশেষ ২০২০ সালে বান্দরবানে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। হামে এভাবে শিশুমৃত্যুর জন্য বিশেষজ্ঞরা অন্তর্বর্তী সরকারের অব্যবস্থাপনাকেই মূলত দায়ী করছেন। তাঁদের মতে, যথাসময়ে টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা না করা, সময়মতো রাজস্ব খাত থেকে টিকা কেনার বরাদ্দ নিশ্চিত না করা, ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ না করা এবং ইউনিসেফের উপর্যুপরি সতর্কতাকে গুরুত্ব না দেওয়া, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা না দেওয়াÑসর্বোপরি বিষয়টিকে একেবারেই গুরুত্ব না দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা যে অপেশাদারসুলভ আরচণ করেছেন, সেটিই এখন কাল হয়েছে। আর এর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানকেও বহন করতে হবে। জাতীয় অধ্যাপক ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রধান ডা. এ কে আজাদ খানও মনে করেন, শিশুরা হামে মারা যাচ্ছে, এর দায় সরকারের, বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের। কারণ তারা শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, হামে আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশ পরবর্তী জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. জিয়াউল হক বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক হলেও দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে ৯৯ শতাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও অক্সিজেনের ঘাটতি দ্রুত শনাক্ত করা না গেলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এসব সুযোগ-সুবিধা সহজলভ্য নয়। আমরা মনে করি, সংক্রমণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আক্রান্তদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
