জাতীয় সংবাদ

অতিবৃষ্টি-বন্যায় ৭ জেলায় মৃত্যু বেড়ে ৫৪

তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপরে
১১ জেলায় চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল

প্রবাহ রিপোর্ট : টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসের কারণে দেশের ৭টি জেলায় ভয়াবহ দুর্যোগ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৩৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জন মানুষ। দুর্গত এলাকায় চাল, শুকনা খাবার, নগদ অর্থ, শিশুখাদ্য ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ ও বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা।
এসব জেলার ৫৯টি উপজেলা, ৩৩৪টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। বর্তমানে পানিবন্দি রয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবার।
ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জন। দুর্গত মানুষের জন্য খোলা ১ হাজার ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ৩৮ হাজারের বেশি মানুষ।
জেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারে সর্বোচ্চ ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামে ১৩ জন, বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে একজন নিহত হয়েছেন।
আহতদের মধ্যে কক্সবাজারে ২৪ জন, চট্টগ্রামে ১২ জন, বান্দরবানে ২ জন এবং খাগড়াছড়িতে একজন রয়েছেন।
ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুর্গত এলাকাগুলোতে চাল, শুকনা খাবার, নগদ অর্থ, শিশুখাদ্য ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ ও বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন জেলায় শত শত মেট্রিক টন চাল, হাজার হাজার শুকনা খাবারের প্যাকেট এবং কোটি টাকার নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকেও অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।
ত্রাণ বরাদ্দের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলা সর্বোচ্চ সহায়তা পেয়েছে। জেলাটির জন্য ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫ হাজার ৮০০ প্যাকেট শুকনা খাবার এবং ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া কক্সবাজারে ৪৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৪৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা, রাঙামাটিতে ৫০০ মেট্রিক টন চাল ও ২৫ লাখ টাকা, বান্দরবানে ৪০০ মেট্রিক টন চাল ও ২০ লাখ টাকা এবং খাগড়াছড়িতে ৪০০ মেট্রিক টন চাল ও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, মৌলভীবাজারে ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা এবং হবিগঞ্জে ১০০ মেট্রিক টন চাল ও ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় ইতোমধ্যে এসব বরাদ্দের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সার্বক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী আরও মানবিক সহায়তা বরাদ্দ দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপরে, নি¤œাঞ্চলে পানি প্রবেশ : নীলফামারীতে তিস্তা নদীর পানি আবারও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উজানের ঢলে পানি বৃদ্ধি পেয়ে ডালিয়া পয়েন্টে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজে পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে সোমবার (১৩ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টায় পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় ৫২ দশমিক ১৮ সেন্টিমিটার, যেখানে বিপৎসীমা নির্ধারিত ৫২ দশমিক ১৫ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপরে নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগে বিকাল ৩টায় পানি বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। এতে নি¤œাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের বাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে।
পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার বিভিন্ন নি¤œাঞ্চলে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এতে পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিসা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, গয়াবাড়ী, গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের নিচু এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং নদীপাড়ের মানুষকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, পানি বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে, যাতে অতিরিক্ত চাপ কমানো যায়। নদীর তীরবর্তী এলাকায় সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
১১ জেলায় চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল, মেডিকেল টিম : বন্যাকবলিত ১১ জেলায় স্বাস্থ্য সেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে সরকার। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি উপজেলায় মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হয়েছে। সাপের কামড়ে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য মাঠপর্যায়ে অ্যান্টিভেনম পাঠানো হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৯৫ জন সাপে কাটা রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে বন্যাকবলিত এলাকায় এখনও কলেরা আক্রান্তের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বন্যা উপদ্রুত এলাকায় গৃহীত স্বাস্থ্য কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন।
মন্ত্রী বলেন, “বন্যা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করাকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ, স্যালাইন, অ্যান্টিভেনম ও অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রী দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “বন্যাকবলিত প্রতিটি উপজেলায় মেডিকেল টিম চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। গর্ভবতী নারী, নবজাতক ও শিশুদের স্বাস্থ্য সেবায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাঠপর্যায়ে ২১ হাজার এবং কেন্দ্রীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাগারে (সিএমএসডি) আরো এক হাজার ভায়ালসহ মোট ২২ হাজার ভায়াল অ্যান্টি-স্নেক ভেনাম মজুত রয়েছে। এছাড়া প্রায় ৭৫ লাখ ৮৫ হাজার প্যাকেট খাবার স্যালাইন (ওআরএস), প্রায় চার লাখ ব্যাগ কলেরা স্যালাইন এবং ৩৬ লাখের বেশি পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট মজুত রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জরুরি স্বাস্থ্য সেবার জন্য জাতীয় স্বাস্থ্য বাতায়নের ১৬২৬৩ নম্বরে অথবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের ০১৭৫৯-১১৪৪৮৮ নম্বরে যোগাযোগ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে গুজবে কান না দিয়ে সরকারি তথ্য অনুসরণ এবং অসুস্থ হলে কাছের মেডিকেল টিমের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বন্যার পাশাপাশি সংক্রামক রোগ পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা গেছেন ২৫ জন। গত বছরের একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫৫।
অন্যদিকে, ১৫ মার্চ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১ লাখ ১১ হাজার ৪৮০ জন। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৫০০ জনের হাম পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ৯০ হাজার ৬০৫ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আদ-দ্বীন হাসপাতাল প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজ করছে। এসব কাজ শেষ হলে হাসপাতালটি পুনরায় পরিদর্শন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button