নির্যাতিতার পরিবারে কান্না, ‘ধর্ষক’ পেল বিশাল পুরস্কার!

# পশ্চিমবঙ্গে কিশোরী রিমি ধর্ষণ-হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে নরক দেখছে মুসলিমরা #
প্রবাহ রিপোর্ট ঃ বারুইপুরের সূর্যপুরে ১১ বছরের মুসলিম কিশোরী রিমিকে পাশবিকভাবে গণধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকা-ের ঘটনায় এখনও উত্তাল গোটা পশ্চিমবঙ্গ। এই জঘন্যতম অপরাধের পর যেখানে প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জোরালো হওয়ার কথা ছিল, সেখানে উল্টো এক বিভীষিকাময় ও পক্ষপাতমূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করা মুসলিমদেরই এখন লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। ন্যায়বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে দমন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ধরপাকড় চালানো হচ্ছে, যার ফলে সূর্যপুর ও এর আশেপাশের গ্রামের পর গ্রাম এখন পুরুষ শূন্য হয়ে পড়েছে। স্থানীয় সূত্র এবং আন্দোলনকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কিশোরী রিমির ওপর হওয়া এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায় নয়, বরং হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যৌথভাবে আন্দোলনে নেমেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন দলমত নির্বিশেষে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। নবগঠিত উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার নিজেদের দায় আড়াল করতে ধর্ষণ-হত্যাকা-ের মতো একটি নারকীয় ঘটনায়ও তাদের সেই চিরাচরিত কূটকৌশল- ‘সাম্প্রদায়িক বিভাজন নীতি’ প্রয়োগ করে পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করা সাধারণ মুসলিমদের বেছে বেছে ‘জিহাদি সন্ত্রাসী সংগঠন’ বা উগ্রপন্থী ট্যাগ দিয়ে দমনপীড়ন করা হচ্ছে। গ্রামের নারীদের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ। ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবারের এক নারী সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘আমাদের স্বামীরা, ছেলেরা ভয়তে ঘরে ঘুমাতে পারছে না, সব পালাচ্ছে। আজ আমার বাচ্চার ক্ষতি হয়েছে বলে মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু এভাবে অত্যাচার ও গ্রেফতার করলে ভবিষ্যতে আর কোনো মেয়ের ক্ষতি হলে কেউ প্রতিবাদ করতে ভয় পাবে।” আন্দোলনের তীব্রতা কমাতে এবং জনমনে আতঙ্ক তৈরি করতে পুলিশ প্রশাসন সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নিরীহ গ্রামবাসীদের হেনস্তা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজসাক্ষীকে সাজানো ‘এনকাউন্টারে’ হত্যা! তদন্তের আগেই দায়মুক্তি দিয়ে অভিযুক্তকে পুরস্কার ঃ এই নৃশংস ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই উঠছে গুরুতর প্রশ্ন। সমাজকর্মী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল অপরাধীদের আড়াল করতেই মামলার প্রধান হাতিয়ার তথা অন্যতম সাক্ষী প্রভাস ম-লকে পুলিশি হেফাজতে সাজানো ‘এনকাউন্টার’ করে হত্যা করা হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, প্রভাস ম-ল ঘটনার সাথে যুক্ত ‘রাজা’ নামে এক মূল অভিযুক্তসহ একাধিক ব্যক্তির নাম বারবার উচ্চারণ করছিলেন। কিন্তু সত্য উদঘাটন হওয়ার আগেই প্রমাণ লোপাট এবং তদন্তের মুখ বন্ধ করতে এই এনকাউন্টার সাজানো হয় বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সমাজকর্মী ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “ইনভেস্টিগেশনের প্রথম হাতিয়ার প্রভাস ম-লকে হত্যা করা হলো প্রমাণ লোপাটের জন্য। সত্য আসবে কী করে?” সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভূমিকা। কোনো প্রকার অফিশিয়াল তদন্ত বা ফরেনসিক রিপোর্ট আসার আগেই মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্য বিবৃতিতে জনতার রোষে গণপিটুনিতে নিহত অন্য এক অভিযুক্তকে ‘নির্দোষ’ বলে ঘোষণা করেছেন। শুধু তাই নয়, তদন্ত প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ প্রভাবিত করে সেই অভিযুক্তের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা পুরস্কার এবং তার ভাইকে সরকারি চাকরি দিয়ে রাতারাতি প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া হয়েছে। অথচ নিহত নাবালিকা মুসলিম কিশোরী রিমির পরিবারের ভাগ্যে এখনও পর্যন্ত কোনো প্রকার সরকারি আর্থিক সহায়তা জোটেনি, মিলেছে কেবলই সান্ত¡না। স্থানীয় ও রাজনৈতিক মহলের অভিযোগ, এই জঘন্য অপরাধের মোড় ঘুরিয়ে দিতে এবং নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে মুসলিম বিদ্বেষী বিভাজনের রাজনীতি উসকে দেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী কোনো তথ্য ছাড়াই আন্দাজে বাম, অতিবাম কিংবা জিহাদি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতার কাল্পনিক গল্প সাজিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন, যা সমাজে অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সিপিএম নেতা লাহেক আলী গ্রেফতার: সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ঃ এদিকে সূর্যপুরের এই নারকীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর রোধ করতে শুভেন্দুর পুলিশ প্রশাসন আরও মরিয়া হয়ে উঠেছে। রবিবার রাতে বারুইপুর থানার পুলিশ গ্রেফতার করেছে প্রবীণ সিপিআইএম নেতা লাহেক আলীকে, যা নিয়ে গোটা রাজ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এনিয়ে মোট আটক ও গ্রেফতার হওয়া প্রতিবাদকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জনে। লাহেক আলীর বিরুদ্ধে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগসহ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ও রেল আইনের অন্তত ১৫টি জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোমবার বারুইপুর আদালতে তোলার সময় পুলিশ তাঁর মাথায় জোরপূর্বক হেলমেট পরিয়ে নিয়ে আসে, যা নিয়ে বাম কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা গেছে। লাহেক আলী নিজে মাথা উঁচু করে আদালতে যেতে চাইলেও পুলিশ নিরাপত্তার অজুহাতে তাঁকে হেলমেট পরায়। সিপিআইএমের পক্ষ থেকে এই গ্রেফতারিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং স্বৈরাচারী পদক্ষেপ বলে অভিহিত করা হয়েছে। দলের প্রাক্তন বিধায়ক সুজন চক্রবর্তী দাবি করেছেন, ঘটনার সময়ের কোনো তথ্য বা সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই না করেই লাহেক আলীকে ফাঁসানো হয়েছে। আদালত চত্বরে প্রিজন ভ্যান থেকে নামার সময় লাহেক আলী নিজেও চিৎকার করে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত মামলা মিথ্যা এবং এটি কেবলই প্রতিবাদের কণ্ঠ রোধ করার চক্রান্ত। ফুঁসছে গোটা পশ্চিমবঙ্গ ঃ গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রশাসনের এমন একনায়কতন্ত্র ও দমনপীড়নের বিরুদ্ধে সামাজিক মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হয়ে উঠেছে। নেটিজেনদের প্রশ্নÑ”১১ বছরের নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যাকা-ে ন্যায়ের আশায় আন্দোলন করা কি তবে এখন রাজ্যে অপরাধ?” অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার বদলে যেভাবে আন্দোলনকারীদের বন্দী করা হচ্ছে, তা পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক চর্চাকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছে। বিচারের বাণী যেখানে নীরবে নিভৃতে কাঁদছে, সেখানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাধারণ ও নিরীহ মানুষদের ওপর প্রয়োগ করা হচ্ছে জটিল সব আইনি ধারা। সূর্যপুরের মানুষ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা কোনো সাম্প্রদায়িক উস্কানি বা বিভাজনের রাজনীতি গ্রহণ করবেন না। অবিলম্বে নিরপরাধ ব্যক্তিদের মুক্তি এবং কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ছাড়া নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত না হলে এই প্রতিবাদের আগুন আরও ভয়াবহ রূপ নেবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।



