সম্পাদকীয়

টিকা কার্যক্রমের আওতা বাড়ান

# জরায়ুমুখের ক্যান্সার #

জীবনযাত্রার পরিবর্তিত ধরন, অত্যধিক দূষণসহ নানা কারণে দ্রুত বাড়ছে ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা। ক্যান্সার রোগীদের সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, গত চার দশকে দেশে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা অন্তত ১০ গুণ বেড়েছে। প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের প্রায় দুই লাখ নতুন রোগী শনাক্ত হয়। মোট রোগীর সংখ্যা ২০ লাখের কম নয় এবং প্রতিবছর মৃত্যু সোয়া লাখের মতো। পরিসংখ্যানের বাইরেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে গতকাল দেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকার প্রকাশিত খবরে বলা হয়, দেশে প্রতিবছর শুধু জরায়ুমুখের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয় প্রায় ৯ হাজার নারী এবং প্রায় অর্ধেকেরই মৃত্যু হয়। গত সোমবার বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ইন্টারন্যাশনাল প্যাপিলোমা ভাইরাস সোসাইটি (আইপিভিএস) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) প্রতিরোধে টিকাদান, স্ক্রিনিং, গবেষণা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণের আহবান জানান। অনুষ্ঠানে আইপিভিএস বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের লিড অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেছা বলেন, এইচপিভি বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ যৌনবাহিত সংক্রমণগুলোর একটি। ভাইরাসটির ২০০টির বেশি ধরন রয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এবং ক্যান্সার সৃষ্টিকারী। বিশেষ করে এইচপিভি-১৬ ও এইচপিভি-১৮ জরায়ুমুখের ক্যান্সারের প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী। এ ছাড়া এই ভাইরাস পায়ুপথ, মুখগহ্বর, যোনিপথ ও পুরুষাঙ্গের ক্যান্সারের সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশে জরায়ুমুখের ক্যান্সার রোধে টিকাদান কর্মসূচি চালু হলেও প্রাথমিকভাবে তা শুধু কিশোরীদের দেওয়া হচ্ছে। অধ্যাপক ডা. আশরাফুন্নেছা বলেন, বর্তমানে স্কুলের পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী এবং কমিউনিটির ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী মেয়েদের এক ডোজ এইচপিভি টিকা দেওয়া হচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই কর্মসূচির আওতায় এসেছে ৮৮.৭ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রাভুক্ত কিশোরী। বিশেষজ্ঞরা বয়সের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি ছেলে ও মেয়ে উভয়কে এই টিকা প্রদানের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা চান, ১১ থেকে ২১ বছর বয়সী সব ছেলেমেয়েকে এই টিকার আওতায় আনা হোক। সব ধরনের ক্যান্সারই দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে ক্যান্সারে মৃত্যুর সংখ্যা। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা শুরু করা গেলে অনেক ক্যান্সারেই পুরোপুরি আরোগ্য লাভ সম্ভব। কিন্তু দেরি করে চিকিৎসায় এলে অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের কিছু করার থাকে না। এ জন্য প্রয়োজন প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্তের প্রক্রিয়া বা স্ক্রিনিং। ক্যান্সার যে অবস্থায় এসেছে তাতে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাতীয়ভিত্তিক স্ক্রিনিং অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও অনেক ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে মেডিক্যাল, রেডিয়েশন, গাইনি, সার্ভিক্যাল, হেমাটো অনকোলজিস্টÑসব মিলিয়ে অনকোলজিস্ট আছেন তিন শর মতো। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী প্রতি এক লাখে একজন হিসেবে আমাদের থাকা প্রয়োজন এক হাজার ৭০০ অনকোলজিস্ট। চিকিৎসা ও রোগ শনাক্তকরণ যন্ত্রপাতির অভাবও তীব্র। ক্যান্সার চিকিৎসার বড় প্রতিবন্ধকতা বিপুল ব্যয়। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত একজন রোগীর চিকিৎসায় গড়ে পাঁচ লাখ ৪৭ হাজার ৮৪০ টাকা নিজ পকেট থেকে খরচ করতে হয়। বেশির ভাগ রোগীর পক্ষে এই ব্যয় বহন করা সম্ভব হয় না। অনেকে মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। আমরা মনে করি, বাংলাদেশে ক্যান্সার মোকাবেলায় সমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। জরায়ুমুখের ক্যান্সার রোধে টিকার আওতা ও স্ক্রিনিং কর্মসূচি বাড়াতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button