খুলনা পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রে সেবার বদলে ভোগান্তি

# ফ্রি ট্রিটমেন্ট পান ইসকন সদস্যরা, মিটিং বসে পরিচালকের কক্ষে
# ২১ বছর একই কেন্দ্রে চাকরি করছেন ডা. ঝর্ণা দাস
# সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন ব্যক্তিগত প্রয়োজনে
# রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠানোর অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার ঃ থাইরয়েড ক্যান্সারসহ জটিল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসেবার অন্যতম সরকারি প্রতিষ্ঠান খুলনা পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রকে ঘিরে উঠেছে সেবাসংকট, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ। সকাল সাড়ে ৮টার আগেই রোগীদের সিরিয়াল গ্রহণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসংখ্য রোগী সেবা না পেয়েই ফিরে যাচ্ছেন। জরুরি প্যাথলজি পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগবে জানিয়ে রোগীদের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। সেবা কেন্দ্রের বেহাল দশার জন্য ভুক্তভোগীরা দায়ি করছেন পরিচালক ডা. ঝর্ণা দাসকে। যিনি টানা ২১ বছর একই কেন্দ্রে চাকরি করছেন। তার বিরুদ্ধে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে বসে উগ্রবাদী ধর্মীয় সংগঠন ‘ইসকন’ এর কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
রোগী, স্বজন এবং প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, জনবল সংকট, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্রের সেবার মান ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত সেবা না পেয়ে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীনে ১৯৮৩ সালে খুলনা পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্র (ইন্সটিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড এলায়েড সায়েন্সেস-ইনমাস) প্রতিষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রের আধুনিকায়ন ও সেবার পরিধি বাড়লেও জনবল সংকট প্রকট। ফলে এক পদের কর্মীকে অন্যত্র কাজ করানো ছাড়াও আউটসোর্সিং কর্মচারী দিয়ে চাহিদা পূরণ করা হয়। এতে কাজের মান খারাপ হওয়ার পাশাপাশি আগত রোগীদের ভাগান্তি পোহাতে হচ্ছে। একই সাথে বাড়ছে অনিয়ম, অব্যবস্থাপন ও দুর্নীতি। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা কর্মচারীরা এসবের প্রতিকার চেয়ে পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর একাধিকবার আবেদন করেছেন। কেনাকাটায় দূর্নীতি তদন্তের জন্য আবেদন করেছেন কমিশনের পরিচালক (অর্থ)’র কাছে।
প্রাপ্ত লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে আগত রোগী ও স্বজনদের সাথে কথা বলে পাওয়া যায় অভিযোগের সত্যতা। সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে রোগীদের সিরিয়াল নেওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রত্যন্ত উপজেলা ও আশপাশের জেলা থেকে আসা মানুষ ফিরে যেতে বাধ্য হন। অত্যাধুনিক চারটি মেশিন থাকা সত্ত্বেও এখানে দিনে ২৫/৩০ টি আলট্রাসনো হয়। হরমোন ও থাইরয়েডের বিভিন্ন ধরনের টেস্টের রিপোর্ট পেতে ৮ থেকে ১০ দিন সময় লাগবে জানিয়ে দ্রুত রিপোর্টের জন্য পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার অথবা সন্ধানী ক্লিনিকে যাওয়ার পরামর্শ দেন খোদ কাউন্টারে কর্মরতরা।
একাধিক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, পরিচালকের স্বেচ্ছাচারি মনোভাব ও খামখেয়ালিপনায় এখানে অনিয়ম জেকে বসেছে। তিনি ২০০৫ সালে এখানে চিকিৎসা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। প্রমোশন পেয়ে ঊর্ধ্বতন চিকিৎসা কর্মকর্তা এবং সবশেষ ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর মুখ্য চিকিৎসা কর্মকর্তা ও পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান। টানা ২১ বছর এক প্রতিষ্ঠানে থাকায় তার স্বেচ্ছাচারিতা পৌঁছেছে চরমে। পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রের চাকরিবিধি অনুযায়ী এক কেন্দ্রে ৩ বছরের বেশি কাজ করার সুযোগ নেই। অথচ কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রতি বিরাগভাজন হলে প্রকাশ্যে অপমান করা, এসিআর খারাপ দেওয়া, এমনকি হয়রানিমূলকভাবে অন্যত্র বদলী করে থাকেন। অতিষ্ঠ হয়ে কেন্দ্রের ১৪ জন কর্মকর্তা কর্মচারী একযোগে বদলী হতে পরিচালক বরাবর আবেদনও করেছিলেন।
তাদের অভিযোগ, ডা. ঝর্ণা দাস কট্টরবাদী ধর্মীয় সংগঠন ইসকন’র সক্রিয় সদস্য ও ডোনার। ইসকন সদস্যরা নিয়মিত তার কাছে যাতায়াত করেন। প্রায়ই তার অফিস রুমে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে মিটিং হয়। সে সময় পরিচালকের রুমে কোন স্টাফের প্রবেশ নিষিদ্ধ। ইসকন সদস্যরা বিনামূল্যে এখানে টেস্ট করান এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই বিশেষ ব্যবস্থায় রিপোর্ট পেয়ে যান। অথচ সাধারণ রোগীদের রিপোর্ট পেতে দুপুর ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। শুভ বলরাম ও জগন্নাথ দাস নামে দুই ব্যক্তির রিসিট পাওয়া গেছে যারা বিনামূল্যে হোল অ্যাবডোমিন আলট্রাসনো করিয়েছেন। এখানে ইসকন সদস্যদের জন্য সব ধরনের ফ্রি টেস্ট নৈমিত্তিক ঘটনা বলে জানা গেছে। তিনি ‘শ্রীমতি ঝর্ণা দেবী দাসী’ নামে ইসকনকে চাঁদা দেন, যার রশিদ সংরক্ষিত আছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পরিচালক হওয়ার পর থেকে ডা. ঝর্ণা দাস রোগী দেখা থেকে বিরত আছেন। অথচ সপ্তাহে ৬দিন তিনি খুলনার একাধিক বেসরকারি প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আলট্রাসনো এবং টিভিএস টেস্ট করেন। পরমাণু কেন্দ্রের চাইতে দ্বিগুণেরও বেশি টেস্ট ফি সেখানে। নগরীর কেডিএ এভিনিউ খলিল চেম্বার মোড়ে অবস্থিত পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বিকেল ৩টায় পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রের সরকারি গাড়িযোগে নিয়মিত আসেন। এখানে একদিনে এক মেশিনে ১৭ জনের আলট্রাসনো করতে দেখা গেছে তাকে। সরকারি যানবাহন ব্যবহার করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে কোন উদ্যোগ নেই।
এ প্রসঙ্গে কথা বলতে পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রে গিয়ে ডা. ঝর্ণা দাসকে পাওয়া যায়নি। ব্যক্তিগত সহকারী সাংবাদিককে জানান ম্যাডাম ছুটিতে আছেন। মোবাইলে যোগাযোগ করে অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলতে সাংবাদিককে তিনি বলেন, মিডিয়ার সাথে আমাদের কথা বলা নিষেধ আছে। আপনি লিখিত আবেদন নিয়ে ঢাকায় যোগাযোগ করেন। এরপর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। মোবাইল ফোনে ও হোয়াটসঅ্যাপে কল দিয়ে ও খুদেবার্তা পাঠিয়েও তার কাছ থেকে আর সাড়া মেলেনি।



