‘আমরা অনেক শক্তিশালী, কেউ কিছু করতে পারবে না।’

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অচেতন অবস্থায় এক রোগীকে প্রায় এক ঘণ্টা আটকে রেখে জোরপূর্বক অন্য অ্যাম্বুলেন্সে স্থানান্তরের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের ক্ষমতাবান দাবি করে বলেন, ‘আমরা অনেক শক্তিশালী, কেউ কিছু করতে পারবে না।’ রোববার (৫ জুলাই) বিকেল সোয়া ৫টার দিকে ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের সামনে এ ঘটনা ঘটে। রোগী নাজমা বেগমের (৬০) ছেলে ইব্রাহিম জানান, তার মা ফেনীতে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অচেতন অবস্থায় দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসকরা সিটি স্ক্যানসহ আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, হাসপাতাল চত্বর থেকেই একটি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করা হয়। ইবনে সিনা হাসপাতালে নেওয়ার জন্য এক হাজার ৫শ থেকে দুই হাজার টাকা ভাড়া চাওয়া হলে কিছুটা কম নেওয়ার অনুরোধ করেন। এরপর রোগীকে অক্সিজেন দিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। কিন্তু হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় পুলিশ ক্যাম্পের সামনে কয়েকজন ব্যক্তি অ্যাম্বুলেন্সটি আটকে দেন। ইব্রাহিমের ভাষ্য, তখন তাকে জানানো হয়, হাসপাতালের বাইরে থেকে আসা কোনো অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নেওয়া যাবে না। পরে তিনি জানতে পারেন যে, অ্যাম্বুলেন্সে তার মাকে তোলা হয়েছিল সেটি হাসপাতালের সিন্ডিকেটভুক্ত নয়, সেটি অন্য একজন রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিল। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমরা তো জানতাম না বাইরের অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নেওয়া যাবে না। হাসপাতালের সামনেই গাড়ি পেয়েছি, সেটাই ভাড়া করেছি। এতে আমাদের কোনো দোষ নেই। অথচ অচেতন অবস্থায় আমার মাকে প্রায় এক ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। আমার মায়ের যদি কোনো ক্ষতি হতো, এর দায় কে নিতো? ইব্রাহিম আরও বলেন, প্রতিবাদ করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, আমরা অনেক শক্তিশালী। অন্য কোনো গাড়িতে রোগী নিতে পারবেন না। আমাদের গাড়িতেই নিতে হবে। কেউ কিছু করতে পারবে না। তার দাবি, তারা আরও বলেন, আপনি বুঝেন না, আমরা কি চুরি করছি? প্রকাশ্যেই রোগী নিয়ে যাচ্ছি। এখানে পুলিশ ক্যাম্প আছে, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ঘোরাফেরা করেন, কেউ কিছু বলে না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতি না থাকলে আমাদের এত সাহস হতো না। দীর্ঘ সময় হয়রানির পর বাধ্য হয়ে হাসপাতালের সিন্ডিকেটভুক্ত একটি অ্যাম্বুলেন্সে করেই তার মাকে ইবনে সিনা হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয় বলে জানান ইব্রাহিম। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনাকারীদের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের এক কর্মকর্তা, নাম প্রকাশ না করার শর্তে, বলেন, সরকারি দু-একটি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে প্রতিদিন শত শত রোগী আনা-নেওয়া সম্ভব নয়। এ ছাড়া সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ঢাকার বাইরে যাওয়ারও নিয়ম নেই। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে হাসপাতাল চত্বরে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। বাইরের অ্যাম্বুলেন্সে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রোগী হাসপাতালে আনা গেলেও, সেসব অ্যাম্বুলেন্সে রোগী নিয়ে হাসপাতাল থেকে বের হতে দেওয়া হয় না। এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং মানবিকতার পরিপন্থি। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, এ ধরনের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা পুলিশ ক্যাম্পে জানতে চাইলে সাধারণত বলা হয়, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু একজন গুরুতর অসুস্থ রোগীর স্বজনের পক্ষে চিকিৎসা ফেলে অভিযোগ দায়ের করা বাস্তবে সম্ভব হয় না। ফলে অধিকাংশ ঘটনাই অভিযোগ ছাড়াই চাপা পড়ে যায়। তিনি আরও দাবি করেন, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের একটি অফিস রয়েছে। অ্যাপভিত্তিক সেবার নামে দ্বিগুণ ভাড়া আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (ইন্সপেক্টর) মো. ফারুক বলেন, ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। তবে আমাদের কাছে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ আসেনি।



