মাথায় গুলির তীব্র যন্ত্রণা এখনো বহন করছেন সিটি কলেজো ক্যারিশামাটিক ছাত্রনেতা সাকিব রেজা

জুলাই আন্দোলনের সেই দিনগুলি-৬
# দেশজুড়ে বাংলা ব্লকেড ঘোষণা #
এম সাইফুল ইসলাম ঃ চব্বিশের ৬ জুলাই শনিবার। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আগের দিনের মতোই বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ সময় আন্দোলনকারীরা সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, ছাত্রধর্মঘট এবং সারা দেশে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধের ডাক দেন। এর নাম দেওয়া হয় ‘বাংলা ব্লকেড’।
জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে খুলনার রাজপথে পরিচিত মুখ ছিলেন সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী এস এম সাকিব রেজা। মিছিলের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া, কর্মসূচির সমন্বয় করা, সহপাঠীদের সংগঠিত করাÑসবকিছুতেই ছিল তার সক্রিয় উপস্থিতি। জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এ ছাত্রনেতাকে আন্দোলনে সরব উপস্থিতির মূল্য দিতে হয়েছে রক্ত দিয়ে। সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। ঘটনার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মাথার পেছনের আঘাতের যন্ত্রণা এখনো বহন করছেন এই তরুণ। পরিবার ও সহযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলেন সাকিব। আন্দোলনের কর্মসূচি কোথায়, কখন এবং কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবেÑএসব সমন্বয়ের কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। প্রতিদিন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করতেন। সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে প্রথম যে মিছির বের হয়, সেখানে সামনের সারিতে ছিলেন সাকিব রেজা। তার সঙ্গে নেতৃত্ব দেন সানজিদ হাসান রাতুল, মো. আওসাফ, মাহাথির ও ইমরানসহ আরও অনেক শিক্ষার্থী। আন্দোলনের বিস্তৃতি ঘটাতে তারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের একত্রিত করার চেষ্টা চালিয়ে যান।
আন্দোলনের সবচেয়ে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন ২ আগস্ট। সেদিন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ গুলি ছোড়ে। সেই সময় সাকিব রেজা গুলিবিদ্ধ হন। সহযোদ্ধারা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালÑআইডিয়া নার্সিং হোমে নিয়ে যান। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেও মাথার পেছনের আঘাতের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে তাকে। আন্দোলনের সময় কেবল শারীরিক আঘাতই নয়, মানসিক চাপেরও মুখোমুখি হতে হয়েছে সাকিবকে। তার সহপাঠীদের দাবি, আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকার কারণে পরবর্তীতে তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে দীর্ঘ সময় খুলনার বাইরে আত্মগোপনে থাকতে হয় তাকে। তবে আত্মগোপনে থাকলেও আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেননি। শহরের বাইরে থেকে এসে কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আবার নিরাপদ স্থানে ফিরে যেতেন। সহযোদ্ধাদের মতে, আন্দোলনের কঠিন সময়ে সাকিব রেজার অন্যতম শক্তি ছিল সাহস ও সাংগঠনিক দক্ষতা। ঝুঁকি জেনেও তিনি রাজপথ ছাড়েননি। অনেক শিক্ষার্থী যখন ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন, তখন তাদের পাশে থেকে আন্দোলনে অংশ নিতে উৎসাহ দিয়েছেন।
জুলাই-আগস্টের সেই আন্দোলন এখন ইতিহাসের অংশ। তবে সেই ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য তরুণের ত্যাগ, রক্ত আর সংগ্রামের গল্প। এস এম সাকিব রেজার জীবনও সেই ইতিহাসের একটি অধ্যায়Ñযেখানে নেতৃত্বের পাশাপাশি রয়েছে গুলিবিদ্ধ হওয়ার বেদনা, চিকিৎসার দীর্ঘ পথ এবং আন্দোলনের আদর্শকে আঁকড়ে ধরে এগিয়ে চলার এক সাহসী কাহিনি।



