জাতীয় সংবাদ

আন্দোলনে কাঁপছে দিল্লি, চাপের মুখে মোদি

১৬ মেট্রো স্টেশন বন্ধ

প্রবাহ ডেস্ক : পরীক্ষাসংক্রান্ত কেলেঙ্কারির পর জবাবদিহি ও সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ভারতের পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় এমপিদের সমর্থন পাওয়ার পর আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বুধবার নয়াদিল্লির প্রতিবাদস্থলে অনলাইন ভিত্তিক ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনে সমর্থকদের বিশাল জমায়েত দেখা গেছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার আর শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও এখন তা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবিতে রূপ নিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-ভিত্তিক আন্দোলন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজিপি) নেতৃত্বে ভারতজুড়ে শুরু হওয়া এই প্রতিবাদ ২০২৪ সালে নরেন্দ্র মোদি পুনরায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর তার সরকারের জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
দিল্লি থেকে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিনিধিরা বলেছেন, দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীরা রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত যন্তর মন্তর ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং সেখানে বুধবার কয়েক হাজার মানুষের সমাগম ঘটেছে। বিক্ষোভকারীরা বর্তমানে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন।
উপস্থিত সমর্থকদের উচ্ছ্বাসের মাঝে সিজিপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা যন্তর মন্তর ছাড়ব না।
‘‘যে দেশে মানুষ প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছিল, যে দেশে সরকারের সমালোচনা করাকে দেশদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য করা হতো; আমরা এখন সেই দেশকে জাগিয়ে তুলেছি।’’
বেশিরভাগ তরুণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন মঙ্গলবার দেশটির বিরোধী দলগুলোর কাছ থেকে সমর্থন পাওয়ার পর নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ওই দিন দেশটির বিরোধী দলগুলো প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবনের সামনে অবস্থান ধর্মঘট পালন করে।
দেশটির বিরোধীদল কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা রাহুল গান্ধী সোমবার লাখ লাখ আন্দোলনকারীর ওপর পুলিশের চালানো দমনপীড়নের জন্য সরকারকে ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি তোলেন। ৫৬ বছর বয়সী রাহুল গান্ধীকে মঙ্গলবার প্রতিবাদস্থল থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে দুই ঘণ্টা আটকে রাখে পুলিশ। বুধবার কালো পোশাক পরে পার্লামেন্টে উপস্থিত হয়ে সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করেছেন তিনি।
বিরোধী সমাজবাদী পার্টি পার্লামেন্ট চত্বরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে। সেখানে দলটির নেতা অখিলেশ যাদব বলেছেন, ভারতের প্রত্যেক তরুণের ওপর প্রভাব ফেলছে, এমন একটি বিষয়ে নরেন্দ্র মোদি নীরব ভূমিকা পালন করে চলেছেন।
আন্দোলন চলছে : গত মে মাসে দেশটির প্রধান বিচারপতি সুর্য কান্ত আদালতে এক মামলার শুনানির সময় তরুণদের ‘ককরোচ’ (তেলাপোকা) এবং ‘পরজীবী’ হিসেবে তুলনা করেন। এই বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিচারপতির এই মন্তব্যের জেরে ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেশটিতে আত্মপ্রকাশ ঘটে অনলাইনভিত্তিক আন্দোলন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ অনুসারী রয়েছে সিজেপির।
পরবর্তীতে বেকারত্ব, তরুণদের কর্মসংস্থান আর মোদির ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের উদ্বেগজনক সব বিষয়কে নিজেদের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে ককরোচ জনতা পার্টি। সোমবার বর্ষাকালীন অধিবেশনের শুরুর দিনে বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টের দিকে পদযাত্রা করার চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে এবং টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
পরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করেন বিক্ষোভকারীরা। তরুণদের এই বিক্ষোভ-প্রতিবাদ গত পাঁচ বছরের মধ্যে দেশটির রাজধানীতে সবচেয়ে বড় রাজপথের সমাবেশে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা দিল্লি বিক্ষোভে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলেছে, দিল্লি পুলিশের পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদ- অনুযায়ী আইনি বাধ্যবাধকতা, প্রয়োজনীয়তা এবং আনুপাতিকতার শর্ত পূরণ করেছে কি না, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
এদিকে, বুধবার আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ তুলে দায়ের করা একটি আবেদনের শুনানি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। যন্তর মন্তরে একদল আন্দোলনকারী প্রায় এক মাস ধরে অবস্থান করছেন। একজন আন্দোলনকারী বলেন, এটিই প্রথমবারের মতো দেশের তরুণদের কথা বলার সুযোগ এনে দিয়েছে।
এএফপিকে কাব্য নামের ২০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বলেন, আমি ভীত। কারণ সোমবার আমি পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের মারধর এবং বলপ্রয়োগ করতে দেখেছি। কিন্তু আমাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনে উপায় নেই।
সমাধানের প্রতিশ্রুতি মন্ত্রীর : ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ পরীক্ষা সংক্রান্ত কয়েকটি অনিয়মের পর এই আন্দোলন শুরু হয়। যে ঘটনার কারণে ২০ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থী পুনরায় পরীক্ষা দিতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রায় ২০ লাখ হাইস্কুল শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ করা পরীক্ষার অনলাইন মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আরেকটি বিতর্কও জনগণের মাঝে ক্ষোভ উসকে দিয়েছে। মেডিকেল পরীক্ষার বিষয়টি নিয়ে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে থাকা শিক্ষামন্ত্রী প্রধান বলেছেন, সরকার সংস্কার এবং পার্লামেন্টে এই বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সোমবারের প্রতিবাদের পর মঙ্গলবার শেষ রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্যে তিনি লেখেন, আমাদের তাদের (শিক্ষার্থীদের) কাছে জবাব, সংস্কার এবং জবাবদিহি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
‘‘তারা বিশৃঙ্খলার চেয়ে নিশ্চয়তা, স্লোগানের চেয়ে সমাধান এবং বিঘœ ঘটানোর চেয়ে দায়িত্বশীলতা বেশি পাওয়ার যোগ্য।’’
সিজিপির প্রতি সমর্থন দিল্লির বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির বাণিজ্যিক রাজধানী-খ্যাত মহারাষ্ট্রের মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও গোয়াতেও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন হাজার হাজার মানুষ।
সূত্র: এএফপি।
উত্তাল দিল্লি, ১৬ মেট্রো স্টেশন বন্ধ : ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ ঘিরে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন। রাজধানীতে নিরাপত্তাজনিত কারণে অন্তত ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার (২২ জুলাই) সকালে রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, মান্ডি হাউস, আইটিও এবং খান মার্কেটসহ দিল্লি মেট্রোর ১৬টি স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। সিজেপির চলমান বিক্ষোভের জেরে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি)।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে লোক কল্যাণ মার্গ, রাজীব চক, প্যাটেল চক, রামকৃষ্ণ আশ্রম মার্গ, বারাখাম্বা রোড, সুপ্রিম কোর্ট, সেবা তীর্থ, জনপথ, মান্ডি হাউস, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, আইটিও, দিল্লি গেট, ইন্দ্রপ্রস্থ, খান মার্কেট, জোর বাগ এবং শিবাজি স্টেডিয়াম মেট্রো স্টেশন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখা হয়েছে।
তবে রাজীব চক, মান্ডি হাউস এবং সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েটে ইন্টারচেঞ্জ সুবিধা চালু রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

এর আগে পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভের ডাক দেয়। এতে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার মানুষ দিল্লিতে সমবেত হওয়ায় সোমবার বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সিজেপির বিক্ষোভে দমন-পীড়নের প্রতিবাদে সরব রয়েছেন দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। এ ঘটনায় মঙ্গলবার তিনি নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। এরপর তিনি পাঁচ দফা দাবি জানান।
এনডিটিভি জানিয়েছে, বিরোধীদলীয় নেতা কেন্দ্রের কাছে পাঁচ দফা দাবি পেশ করেছেন। তিনি ছাত্রছাত্রীদের শোষণের জন্য সরকারকে অভিযুক্ত করেছেন এবং নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিতর্কের জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করেছেন।
এর আগে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং কংগ্রেসের বেশ কয়েকজন নেতাকে দিল্লি পুলিশ আটক করে। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
রাহুল গান্ধীকে ছত্রসাল স্টেডিয়ামে এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদরাকে মন্দির মার্গ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সাবেক কংগ্রেস সভাপতি সোনিয়া গান্ধী থানায় গিয়ে প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে দেখা করেন। পরে রাত ৯টার দিকে দুই ভাইবোনকেই ছেড়ে দেওয়া হয়।
আটক থাকাকালে রাহুল গান্ধী সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়ে একটি ভিডিও বিবৃতি প্রকাশ করেন। এতে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানান।
এ ছাড়া সোমবার শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার, বিক্ষোভ দমনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা প্রার্থনা, সংসদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এবং যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানান।
সূত্র: এনডিটিভি

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button