বৈদেশিক কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে কমাতে হবে অভিবাসন ব্যয়

বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের শ্রমবাজার স্থবির। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করছে। গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’ (জবলেস গ্রোথ) অর্জন করেছে। ফলে ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তির মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে এ সংকট আরও প্রকট। সাম্প্রতিক শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, শিক্ষার স্তর যত বাড়ছে, বেকারত্বের হারও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রাথমিক শিক্ষাপ্রাপ্তদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ, মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রাপ্তদের মধ্যে ২ দশমিক ৯১ শতাংশ; অথচ উচ্চশিক্ষিতদের ক্ষেত্রে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশে। এর প্রধান কারণ সম্ভবত আনুষ্ঠানিক খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব, যেখানে অধিকাংশ উচ্চশিক্ষিত তরুণ কাজের সুযোগ খোঁজেন। সম্প্রতি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে সরকার ১ কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। দেশের জনমিতিক সুবিধা (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড) কাজে লাগাতে এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে এ লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় বাধা হলো জনশক্তি রপ্তানি ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের ঘাটতি এবং বাংলাদেশ ও শ্রমগ্রহণকারী দেশগুলোয় বিদ্যমান নানা প্রতিবন্ধকতা। বিদেশে কর্মী পাঠানোর অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো অত্যধিক অভিবাসন ব্যয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভিয়েতনামের কর্মীদের নিয়োগ ব্যয় সর্বোচ্চ প্রায় ৬ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ লাখ ১ হাজার টাকা)। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, যেখানে একজন পুরুষ কর্মীকে বিদেশে যেতে গড়ে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ ডলার বা ৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকারও বেশি ব্যয় করতে হয়। ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে এ ব্যয় গড়ে ৭ মাসের আয়ের সমান হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১৫ মাসের আয়ের সমান। আর সৌদি আরবগামী বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য এ ব্যয় প্রায় ২০ মাসের আয়ের সমান। অর্থাৎ আপেক্ষিক বিচারে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অভিবাসন ব্যয় বহন করতে হয় বাংলাদেশি কর্মীদের। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কার মতো শ্রম রপ্তানিকারক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যয় চার থেকে পাঁচগুণ বেশি। বাংলাদেশের অভিবাসন ও রেমিট্যান্স নীতিতে দারিদ্র্য বিমোচনের অন্যতম কার্যকর হাতিয়ার হিসাবে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্সকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অস্বাভাবিক উচ্চ অভিবাসন ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সরকার বিভিন্ন গন্তব্য দেশের জন্য অভিবাসন ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে। যেমন ২০১৭ সালে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে যেতে যথাক্রমে ১ লাখ ৬৫ হাজার, ১ লাখ ৬০ হাজার এবং ২ লাখ ৬২ হাজার ২৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ কর্মীকেই সরকারি নির্ধারিত সীমার কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। অত্যধিক অভিবাসন ব্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ বাংলাদেশের বহুস্তরবিশিষ্ট জনশক্তি নিয়োগ ব্যবস্থা। অধিকাংশ রিক্রুটিং এজেন্সি বিদেশি নিয়োগকর্তার কাছ থেকে সরাসরি চাহিদাপত্র (ডিমান্ড লেটার বা ভিসা) সংগ্রহ করে না; বরং বিদেশি দালাল বা এজেন্সির কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে তা কিনে আনে। অনেক ক্ষেত্রে একটি ডিমান্ড লেটার বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগে একাধিকবার হাতবদল হয়। ডিমান্ড লেটার দেশে আসার পর রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে কর্মী সংগ্রহ করে। প্রতিটি স্তরের দালাল নিজস্ব কমিশন যোগ করে। শেষ পর্যন্ত এ কমিশন ও অতিরিক্ত মুনাফার পুরো বোঝা বহন করতে হয় অভিবাসী কর্মীদের। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এবং দেশের বেকারত্ব সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে সরকারকে অভিবাসন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে হবে। একইসঙ্গে অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই বিদেশে এক কোটি কর্মী পাঠানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বাস্তবায়নের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
