মার্কিন আকাশের কাছাকাছি বিমানে আঘাত হানবে চীনের নতুন ক্ষেপণাস্ত্র

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ উৎক্ষেপণস্থল থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমার কাছে থাকা বিমানে আঘাত হানতে সক্ষম এক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে চীন। মঙ্গলবার চীনা সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চীন এমন হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল তৈরি করেছে; যা হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল এয়ারক্রাফটের মতো দূরপাল্লার উচ্চমূল্যের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে সক্ষম। এই বিষয়ে সরাসরি অবগত একটি সূত্র ব্লুমবার্গকে চীনের নতুন এই অস্ত্রের তথ্য জানিয়েছে। ইরানের সঙ্গে ছয় মাসের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার অস্ত্রের সরবরাহ সংকটে ভুগছে, ঠিক তখনই বেইজিংয়ের অস্ত্রাগারে যুক্ত হয়েছে এই শক্তিশালী প্রযুক্তি। চীনা এই প্রযুক্তি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার, আকাশ থেকে আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণকারী বিমান এবং উড়ন্ত কমান্ড পোস্টের মতো বিমানগুলোর জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি ব্লুমবার্গকে বলেছেন, চীনা সামরিক বাহিনী কিছু হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে আকাশ থেকে আকাশে লক্ষ্যভেদের প্রযুক্তি যুক্ত করেছে। পাশাপাশি কয়েকটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে জাহাজ-বিধ্বংসী সক্ষমতাও তৈরি করেছে। বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে চীনই প্রকাশ্যে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে সক্ষম হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল (এইচজিভি) তৈরি ও পরিচালনা করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের সংগ্রহে ৩ হাজার ১৫০টিরও বেশি ব্যালিস্টিক অস্ত্র রয়েছে; যা বিশ্বে সর্বাধিক। সামরিক অভিযানের পরিধি বাড়াতে বেইজিং যেভাবে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র বহরকে ঢেলে সাজাচ্ছে, এই অর্জন তারই অন্যতম বড় দৃষ্টান্ত। চীনের নতুন অস্ত্রের কার্যকারিতা ঃ হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল (এইচজিভি) মূলত এক ধরনের বিশেষ ওয়ারহেড। এই ওয়ারহেড ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে উৎক্ষেপণের পর বায়ুম-লে শব্দের চেয়ে বহুগুণ দ্রুতগতিতে দিক পরিবর্তন করে উড়ে যেতে পারে। লক্ষ্যবস্তুর দিকে যাওয়ার পথে হঠাৎ দিক পরিবর্তনের ক্ষমতার কারণে এর আঘাত হানার সীমা যেমন বাড়ে, তেমনি মাঝপথে একে ধ্বংস বা আটকে দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। চীনের ডিএফ-১৭ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে উৎক্ষেপণ করা একটি এইচজিভি প্রায় ২ হাজার ৪১৪ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এই দূরত্ব চীন থেকে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সামরিক ঘাঁটি গুয়াম ভূখ-ের ব্যবধানের প্রায় সমান। অন্যদিকে, বেইজিংয়ের আরও সর্বাধুনিক ডিএফ-২৭ ক্ষেপণাস্ত্রের আনুমানিক পাল্লা প্রায় ৮,০০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ, চীন থেকে প্রায় হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মতো সুদূরবর্তী অঞ্চলের মার্কিন সামরিক সরঞ্জামও এখন এই ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। তবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রূপান্তর করে দূরবর্তী উড়োজাহাজে আক্রমণ করা বেশ ব্যয়বহুল, কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সর্বোচ্চ দূরত্ব অতিক্রম করে কোনো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে একটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অন্তত ২০ মিনিট বা তার বেশি সময় লাগে। এজন্য পুরো সময়জুড়ে নিখুঁত ও ক্রমাগত হালনাগাদকৃত উপাত্ত প্রয়োজন হয়। দূরবর্তী সেন্সর থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের কাছে তথ্য পৌঁছানোর এই দীর্ঘ প্রক্রিয়াকে সামরিক ভাষায় ‘কিল চেইন’ বলা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এই কিল চেইনের সময়সীমা বেশি হওয়ায় প্রতিপক্ষের পক্ষে এতে দূর থেকেই ব্যাঘাত ঘটানো বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া সহজ। এছাড়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালালে প্রতিপক্ষ দেশ একে পারমাণবিক আক্রমণ মনে করে ভুল করতে পারে। ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণ বলছে, এই ধরনের ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি অস্ত্রটির ব্যবহারকে জটিল করে তোলে; বিশেষ করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সময়, এটি অনাকাক্সিক্ষতভাবে পারমাণবিক সংঘাত উসকে দিতে পারে। এসব ঝুঁকি সত্ত্বেও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন কাজ আরও দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে বেইজিং। চীনের দ্রুত বর্ধনশীল অস্ত্রভা-ার ঃ ২০২৬ সালের এক সামরিক প্রতিবেদনে মার্কিন বিমান বাহিনীর চায়না অ্যারোস্পেস স্টাডিজ ইনস্টিটিউট বলেছে, চীনের আধুনিকীকরণ প্রচেষ্টায় এখন প্রতিপক্ষের পুরো সামরিক কাঠামোজুড়ে একই সঙ্গে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করার সক্ষমতাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এর আগে, গত মে মাসের এক প্রতিবেদনে ব্লুমবার্গ বলেছিল, সামরিক খাতে বেইজিং অভাবনীয় অর্থ বিনিয়োগ করছে। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ২০২৫ সালে এসে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের গতি পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পেন্টাগনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সাল নাগাদ চীনের সামরিক বহরে অন্তত ৩ হাজার ১৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৩০০টি স্থলভিত্তিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রথম এসব তথ্য প্রকাশ করা শুরু করে, তার তুলনায় চীনে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা যথাক্রমে ১৪৭ শতাংশ এবং ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংঘাতের ভবিষ্যৎ ও মার্কিন তৎপরতা ঃ ভবিষ্যতের যেকোনো সামরিক সংঘাত মোকাবিলায় দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রকে মূল নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র আরটিএক্স কর্পের এসএম-৬ এয়ার ডিফেন্স মিসাইলের ওপর ভিত্তি করে এআইএম-১৭৪বি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। এর সঠিক পাল্লার তথ্য গোপন রাখা হলেও স্থলভিত্তিক এসএম-৬ অন্তত ২৫০ মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। মার্কিন নৌবাহিনী বলেছে, তারা রায়থন কোংয়ের তৈরি এআইএম-৪২৪ ম্যালিস নামের নতুন একটি আকাশ থেকে আকাশে হামলাকারী ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করছে; যার পাল্লা ৩০০ মাইলেরও বেশি। এছাড়া লকহিড মার্টিন কর্পের তৈরি এআইএম-২৬০ ক্ষেপণাস্ত্রটি বর্তমানে উৎপাদন পর্যায়ে রয়েছে। এটি এখনও সামরিক বাহিনীতে যুক্ত না হলেও এর পাল্লা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অপরদিকে ইউরোপের দেশগুলোতে বহুল ব্যবহৃত এমবিডিএ ক্ষেপণাস্ত্রের সিস্টেমসের ‘মিটিওর’ ক্ষেপণাস্ত্র রামজেট ইঞ্জিনচালিত। এই ক্ষেপণাস্ত্র ১০০ মাইলেরও বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুকে নির্ভুলভাবে ধ্বংস করতে পারে। সূত্র: ব্লুমবার্গ।



