রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর : প্রত্যাবাসন জরুরি

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কোনোই অগ্রগতি নেই। বরং দীর্ঘ ৯ বছরে রোহিঙ্গা সংকট ফুলেফেঁপে পর্বতসম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সময়ের মধ্যে একজন রোহিঙ্গাও মিয়ানমারে ফেরত যায়নি, উল্টো আরো কয়েক লাখ রোহিঙ্গা যোগ হয়েছে। এর সঙ্গে ক্যাম্পগুলোয় পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মাদক, মানবপাচার, খুনখারাবি, চোরাচালান, সন্ত্রাসের মতো ভয়াবহ সব অপরাধ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নানা সময় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। সম্প্রতি একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের তৎপরতার খবর পেয়ে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালায়। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে গোপন সুড়ঙ্গ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় ঘর, কিন্তু মাটির নিচে সুড়ঙ্গ দিয়ে অনায়াসেই অপরাধীরা পালিয়ে যেতে পারে। খবরে বলা হয়েছে, ক্যাম্পে এক ডজনের বেশি সশস্ত্র চক্র সক্রিয় রয়েছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে মাদক কারবার। ধারণা করা হয়, টেকনাফ-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলে যে মাদকের ভয়াল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, এর অন্যতম আখড়া এই রোহিঙ্গা ক্যাম্প। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত গত সাত বছরে ক্যাম্পগুলো থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৪৮ লাখ ৯৭ হাজার ৮২৩ পিস ইয়াবা। এ ছাড়া ১২৮ কেজি ৭১৯ গ্রাম গাঁজা, ৪৯৪.০৫ লিটার দেশি মদসহ আরো মাদকদ্রক্য উদ্ধার করা হয়েছে। গত ৯ বছরে ২৮৮টি হত্যাকা-ের ঘটনায় ২৭৭টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামি প্রায় দুই হাজার। অস্ত্র ও দস্যুতার ১৬৫ মামলায় আসামি ৩১২ জন। ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ৩৫২ মামলায় আসামি ৫২১ জন। অপহরণের ৩০৬ মামলায় আসামি ৩৫৩ জন। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান নিয়মিত চলে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। পাশাপাশি রয়েছে সমন্বয়হীনতার অভিযোগও। কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান বলেন, ‘সপ্তাহের শুক্র ও শনিবার যদি ক্যাম্পে কোনো অভিযান চালানোর প্রয়োজন হয়ে পড়ে, তখন নির্বাহী ম্যাজেস্ট্রেসির ক্ষমতাপ্রাপ্ত কাউকে পাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়ে।’ প্রকৃত চিত্র এটাই, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান, বিপুল জনসংখ্যা এবং সশস্ত্র অপরাধীচক্রের তৎপরতার কারণে ক্যাম্পে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ মারাত্মক কঠিন হয়ে পড়েছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় সাড়ে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের হিসাবেই তা এখন দাঁড়িয়েছে ১২ লাখে। অন্যান্য হিসাবে এই সংখ্যা ১৫ লাখ। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য শুধু মানবিক সংকটই নয়, বরং এক বিরাট সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া দুঃখজনক হলেও সত্য, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে সহানুভূতি শুরুতে ছিল, তা এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা ছাড়া এই মানবিক বিপর্যয় বাংলাদেশের একার পক্ষে কাটানো সম্ভব নয়। শরণার্থী বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন মনে করেন, বাংলাদেশকে একটি কার্যকর, বাস্তবসম্মত এবং আউটকাম-বেইসড ফরেন পলিসি গ্রহণ করতে হবে, যা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে একটা সমন্বিত সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণে বাংলাদেশকে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে বাধ্য করবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কনভিন্স করবে। আমরা মনে করি, এই সংকট বছরের পর বছর চলতে পারে না। দেখা গেছে, সময় যত গড়িয়েছে সংকট আরো জটিল হয়েছে। কাজেই এমন প্রেক্ষাপটে সামনে পথ একটাইÑরোহিঙ্গাদের নিজভূমে প্রত্যাবাসন।
