জাতীয় সংবাদ

মেট্রোরেলে এমআরটি পুলিশ সংকট : স্টেশনের ৮ আর্চওয়ের ৪টিই বিকল

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ রাজধানীর দ্রুততম ও স্বাচ্ছন্দ্যের গণপরিবহন মেট্রোরেল প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন লাখ যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে। অফিসগামী যাত্রীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও, এর স্টেশন ও ট্রেনগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্যের অভাব, আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতি এবং এমআরটি পুলিশের পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র ইউনিট না থাকায় এ গুরুত্বপূর্ণ কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। মেট্রোরেলের ১৬ স্টেশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ‘ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) পুলিশ’ নামের বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করলেও প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে তা এখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী জনবল অনুমোদন পেলেও বাস্তবে এমআরটি পুলিশ প্রয়োজনের চেয়ে নিয়োজিত রয়েছে কম। এমআরটি পুলিশের পরিদর্শক (অপারেশন) মোহাম্মদ মহসিন বাংলানিউজকে জানান, ১৬ স্টেশনে তিন শিফটে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের জন্য মোট ৪শ ৮০ জন পুলিশ সদস্যের প্রয়োজন। প্রতিটি স্টেশনে গড়ে চারটি প্রবেশ ও বহির্গমন পথ রয়েছে। ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রতি গেটে দুইজন করে আটজন এবং একজন ইনচার্জসহ কমপক্ষে ১০ জন সদস্যের প্রয়োজন হলেও বাস্তবে তা নেই। বর্তমানে উত্তরা উত্তর, মিরপুর-১০, সচিবালয়, মতিঝিল, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, শেওড়াপাড়া ও পল্লবী এলাকার মতো ব্যস্ত স্টেশনগুলোতে নয় থেকে ১০ জন সদস্য দেওয়া হলেও অন্য স্টেশনগুলোতে সংখ্যাটি আরও কম। আগস্ট উপলক্ষে বিশেষ নিরাপত্তায় এপিবিএনের ১শ জন সদস্য দুই শিফটে বাড়তি দায়িত্ব পালন করলেও তা স্থায়ী সমাধান নয়। মেট্রোরেল স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য না থাকায় প্রবেশপথ, টিকিট কাউন্টার ও প্ল্যাটফর্মে প্রতিনিয়ত যাত্রীদের তল্লাশি করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, স্টেশনগুলোতে মাদক ও অস্ত্র শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তির সংকট রয়েছে। মেটাল ডিটেক্টর বা সাধারণ আর্চওয়ে মাদক শনাক্ত করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। চাবি, লাইটার কিংবা অস্ত্র সবকিছুতেই আর্চওয়ে একই ধরনের সংকেত দেয়। এর ওপর সচিবালয় ও উত্তরা উত্তর স্টেশনের আটটি আর্চওয়ের মধ্যে চারটিই বর্তমানে নষ্ট। মাদক কারবারিরা পুলিশের এই দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। পেট বা শরীরের ভেতরে করে অভিনব কায়দায় মাদক পাচার রোধে দেহ তল্লাশি বা মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে করা সম্ভব নয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের এক্স-রে বা আল্ট্রাসোনোগ্রামের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হয়। অস্ত্র, বিস্ফোরকদ্রব্য ও মাদক আলাদাভাবে শনাক্ত করতে বিমানবন্দরে ব্যবহৃত ‘লাগেজ স্ক্যানার’ স্থাপনের জন্য ডিএমটিসিএলের কাছে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা এখনো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। এমআরটি পুলিশের নিজস্ব কোনো স্বতন্ত্র ইউনিট না থাকায় প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রমে নানা জটিলতা পোহাতে হচ্ছে। সদস্যদের বেতন বিভিন্ন জেলার কোড থেকে হওয়ায় এবং নিজস্ব বাজেট কাঠামো না থাকায় মাঠপর্যায়ে কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে। মেট্রোরেল স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত এসি বা ফ্যানের ব্যবস্থা না থাকায় তীব্র গরমে ছোট কক্ষে ডিউটিরত এমআরটি পুলিশ সদস্যদের কষ্ট হচ্ছে। ডিএমপি বা অন্য জেলার মতো মেট্রোরেল পুলিশকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ইউনিটে রূপান্তর না করা পর্যন্ত এ জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট কাটানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। মেট্রোরেলের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহনের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক লাগেজ স্ক্যানার স্থাপন এবং এমআরটি পুলিশকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র ইউনিটে রূপান্তর করা সময়ের দাবি। অন্যথায় সামান্য অবহেলা কিংবা প্রযুক্তির ঘাটতি ভবিষ্যতে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। মেট্রোরেলের নিয়মিত যাত্রী হাসান বাংলানিউজকে বলেন, এমআরটি কার্ডের যাত্রীরা কার্ড পাঞ্চ করে এন্ট্রি নিয়ে ট্রেনে গন্তব্েয যেতে পারেন। এন্ট্রি নেওয়ার সময় পাশেই দুই থেকে তিনজন পুলিশ সদস্যকে দেখা গেলেও তারা যাত্রীদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে তেমন সাড়া দেয় না। তিনি বলেন, কার্ডধারী যাত্রীর পাশাপাশি স্টেশনে প্রচুর যাত্রীকে টিকিটের জন্য সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। মাঝেমধ্যে যাত্রীর ব্যাগ তল্লাশি করতে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের দেখা গেলেও বগিগুলোতে তাদের দেখা যায় না। তিনি আরও বলেন, ভিড়ের মধ্যে অনেক সময় যাত্রীরা বাগ-বিত-ায় জড়িয়ে পড়ে। এ সময় তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে মেট্রোর পুলিশ সদস্য থাকলে ভালো হতো। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) মেজর মোহাম্মদ জাকির সিদ্দিকী (অব.) বাংলানিউজকে বলেন, মেট্রোস্টেশনগুলোতে মাদক ও অবৈধ অস্ত্র নিখুঁতভাবে শনাক্তকরণের জন্য আধুনিক লাগেজ স্ক্যানার বসানোর বিষয়টি এখন একদম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা ও প্রক্রিয়া প্রায় শেষ। আগামী সোমবারের বোর্ড মিটিংয়ে বিষয়টি উত্থাপিত হওয়ার কথা রয়েছে এবং তা অনুমোদিত হলে বরাদ্দ করা বাজেটের মাধ্যমে খুব দ্রুতই পাইলট প্রকল্প হিসেবে কয়েকটি স্টেশনে এটি চালু করা হবে। আর্চওয়ে গেট এক ধরনের দরজা যার মধ্য দিয়ে মানুষ চলাচল করে এবং এটি কারো কাছে মেটাল জাতীয় কোনো বস্তু থাকলে সেটা সাথে সাথে শনাক্ত করে ফেলে। এটার উচ্চতা পর্যাপ্ত থাকায় এটি দিয়ে ছোট-বড় সবাই সহজেই প্রবেশ করতে পারে। আর্চওয়ে গেট নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ গেট ছুরি এবং বন্দুকের মতো অস্ত্রও শনাক্ত করে, যা বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মেটাল ডিটেকটর মেশিনের মাধ্যমে শরীর স্ক্যান করে দেখা হয় যে শরীরে কোনো মেটাল রয়েছে কি না, তাকে আর্চওয়ে গেট মেটাল ডিটেকটর বলে। আর্চওয়ে গেট ছাড়াও শরীর স্ক্যান করার জন্য হ্যান্ড হেল্ড মেটাল ডিটেকটরও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু পরিপূর্ণ নিরাপত্তার জন্য আর্চওয়ে গেট মেটাল ডিটেকটর ব্যবহার করতে হয়।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button