অবহেলিত একটি জনপদের নাম কয়রা-(৩)

# দুর্যোগ আর লবনাক্ততায় দিশেহারা সুন্দরবন উপকূলের মানুষ
রিয়াছাদ আলী, কয়রা (খুলনা) ঃ উপকূলীয় জনপদ খুলনা জেলার কয়রার মানুষ বারবার দুর্যোগে কবলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শত বাধা পেরিয়ে আবারও উঠে দাঁড়ায়। প্রতিটি দুর্যোগ ও ঘূর্ণিঝড়ের পর তারা ঘর তোলে, বীজ বোনে, আবার নতুন করে বাঁচতে শেখে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গেলেও হার মানে না উপকূলের মানুষ। তারা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করেই বেঁচে থাকে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল আজ শুধু দুর্যোগের গল্প নয়, এটি টিকে থাকা ও অভিযোজনের লড়াই আর আশার প্রতীক। এক কথায় দক্ষিণাঞ্চলের এই উপকূল যেন প্রকৃতির পরীক্ষাগার। কয়রা উপজেলায় ২ লক্ষ ২০ হাজর মানুষের বসবাস। এর মধ্যে প্রতিনিয়ত দুর্যোগ ঝুঁকিতে রয়েছেন ১ লাখ মানুষ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় থেকে শুরু করে ১৯৮৮ ও ১৯৯১ সালের বন্যা, ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা, আর ২০২০ সালের আম্পান- প্রতিটি দুর্যোগই খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা উপকূলের মানুষের জীবন ও জীবিকায় গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। আইলা ও আম্পানের ক্ষয়ক্ষতিতে শুধু খুলনা-সাতক্ষীরার উপকূলে প্রায় ৫০ হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। চিরতরে নষ্ট হয়ে গেছে ২৫ হাজার হেক্টর কৃষিজমি। কয়রার কাটকাটা গ্রামের বাসিন্দা তাজমিনুর রহমান বলেন, কয়রায় বেড়িবাঁধ আছে, কিন্তু টেকে না। আমরা প্রতি বছর বাঁধ দেখি, আবার তা ভেঙে যেতেও দেখি। মাটি কেটে তাড়াহুড়ো করে দিলে সেটা তো টিকবে না। সামান্য বৃষ্টি আর জোয়ারের পানি আসলেই সব শেষ। পানি উন্নয়ন বোর্ড যেভাবে বাঁধ দিচ্ছে, তা অনেকেটাই প্রহসন। দুই এক বছরে বাঁধের ঠিক এক পাশ ঘেঁষে নদীর প্রবল জোয়ারের তোড়ে কপোতাক্ষ নদ এখন কাশীর হাটখোলা খেয়াঘাট থেকে সাতক্ষীরার গাবুরা পর্যন্ত নতুন চর তৈরি করছে। নদীর বাঁক পরিবর্তন হয়ে৷ যাওয়ায় কয়রার মূল অংশে হুমকি তৈরি হয়েছে এগুলো সব জলবায়ু পরিবর্তন জনিত সমস্যা। এ সমস্যা থেকে রেহাই পেতে বাস্তবমুখী প্রকল্প গ্রহন করতে হবে।
সরেজমিন দেখা গেছে, নদী ভাঙ্গন ও ঘূর্ণিঝড়ে ঘরবাড়ি হারিয়ে উপকূলের বহু মানুষ এখন শহরমুখী। কৃষক হচ্ছেন রিকশাচালক, মৎস্যজীবী হচ্ছেন দিনমজুর- ফলে ভেঙে পড়ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসার মোঃ আব্দুল্লাহ আল জাবির বলেন, দুর্যোগে মানুষকে সচেতন করতে সরকারিভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
কয়রা সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এইচ এম হুমায়ুন কবির বলেন, কয়রায়
লবণ পানি প্রবেশের ফলে ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। দেখা দেয় সুপেয় পানিরও মারাত্মক অভাব। মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয় উপকূলের বাসিন্দারা। অতিরিক্ত লবণ পানির প্রভাবে বিভিন্ন গাছপালা মারা যায়। এ ছাড়া লবণাক্ততার ফলে অনেক কৃষক কৃষি কাজে অনীহা দেখাচ্ছে। প্রতি বছর কয়রা উপজেলার উপকূলীয় এলাকার উর্বর জমি লবণ পানিতে তলিয়ে গেলে, বৃষ্টিতে সেই লবণাক্ততা কাটাতে প্রায় দুই তিন বছর সময় লাগে। কিন্তু লবণাক্ততা কাটতে না কাটতেই আবার প্লাবিত হয় এলাকা। এ থেকে পরিত্রান পেতে পরিকল্পনা মাফিক বেড়িবাঁধ নির্মান করতে হবে। খুলনা জেলা বিএনপির সদস্য এম এ হাসান বলেন, কয়রা একটি মৎস্য সম্পদশীল এলাকা। এখানকার মৎস্য চাষী ও ব্যবসায়ীদের আধুনিক চাষাবাদে উৎসাহিত করতে হবে। তাহলে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ে মৎস্য চাষ করে টিকে থাকতে পারবে চাষিরা। কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ সুজিত কুমার বৈদ্য বলেন, লবন পানির ব্যবহারে নারীদের বিভিন্ন সমস্যার পাশাপাশি অনেক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক নারী লজ্জায় তাদের সমস্যার কথা বলকে পারেনা। এ জন্য সচেতনতামুলক কর্মুসচীর মাধ্যমে তাদেরকে সচেতন করতে হবে। কয়রা- পাইকগাছার সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, কয়রা একটি দুর্যোগপুর্ন এলাকা। প্রতিনয়ত এই অঞ্চলের মানুষ দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। সেই দিকটা বিবেচনা করে এই অঞ্চলে বেশি বেশি বরাদ্দ দেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে বলে তিনি জানান।



