বাংলাদেশে যৌতুক প্রথার আধুনিক রূপ

বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা যৌতুক প্রথা আজও বন্ধ হয়নি, বরং সময়ের সঙ্গে এটি নতুন রূপ ধারণ করেছে। একসময় যেখানে যৌতুক অর্থ বা গয়নাগাটির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা ছদ্মবেশে ‘উপহার’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গাইবান্ধার রুবিনা আক্তারের ঘটনাটি তারই একটি প্রতিফলন। সদ্য বিবাহিত রুবিনা যখন শ^শুরবাড়িতে পা রাখলেন, তখন থেকেই আত্মীয়-স্বজনদের প্রশ্নের মুখে পড়লেনÑবাপের বাড়ি থেকে কী কী দিয়েছেন? নতুন ঘর সাজানোর জন্য কী উপহার এসেছে? এমন প্রশ্ন বাংলাদেশের শহর ও গ্রামের প্রায় প্রতিটি নববধূকেই শুনতে হয়। পরিবারগুলো এখন সরাসরি যৌতুকের কথা না বললেও মেয়ের সুখের জন্য নানা উপহার দেওয়াকে একপ্রকার সামাজিক রীতিতে পরিণত করা হয়েছে। বস্তুত, যৌতুকের এই আধুনিক রূপের কারণে সমাজে নারীদের প্রতি সহিংসতা কমেনি, বরং বেড়েছে। ২০২৪ সালেই পুলিশের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ৪৭৩ জন নারী যৌতুক সংক্রান্ত নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন। অনেক পরিবার শুধু সামাজিক মর্যাদার কথা চিন্তা করে মেয়ের শ^শুরবাড়িতে এসি, ফার্নিচার, গাড়ি, টিভি পাঠায়, যা এক ধরনের চাপের সৃষ্টি করে। উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য হয়তো এটি সমস্যা নয়, কিন্তু নি¤œবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য এটি অনেক সময় দুর্বিষহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ধার করে, জায়গা বিক্রি করে, কিংবা চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়েও তারা এই তথাকথিত ‘উপহার’ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ধরনের সামাজিক বাস্তবতা আরও ভয়াবহ রূপ নেয় যখন মেয়ের পরিবার থেকে পুনরায় অর্থ বা সম্পদ চাওয়া হয়, আর তা না পেলে মেয়েটিকে নির্যাতন করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সাতক্ষীরায় খাদিজা খাতুন নামে এক নববধূর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণ করে, যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতা এখনো সমাজে বিদ্যমান। খাদিজার স্বামী আমিরুল ইসলাম বিয়ের পর থেকেই তার উপর চাপ প্রয়োগ করছিলেন যৌতুকের জন্য। শেষ পর্যন্ত এই নিষ্ঠুর প্রথার শিকার হয়ে তাকে প্রাণ হারাতে হলো। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো যৌতুক বিরোধী আইন কার্যকর করছে ঠিকই, তবে অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগগুলোকে আমলে নেওয়া হয় না। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান এই পরিস্থিতিকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করেছেন এবং যৌতুক বন্ধে শুধু আইনি পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন। সচেতনতা বৃদ্ধির প্রচার কার্যক্রম একসময় সরকার ও বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে চালানো হলেও বর্তমানে এ ধরনের উদ্যোগের অভাব দেখা যাচ্ছে। অথচ এই প্রথা নির্মূল করতে হলে পরিবার ও সমাজকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে হবে এবং বিয়েকে প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়বহুল উৎসবে পরিণত করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিটি পরিবারকে যৌতুক ও এর আধুনিক রূপ ‘উপহার’ গ্রহণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। নয়তো যৌতুক নামক অভিশাপ থেকে বাংলাদেশ কখনো মুক্তি পাবে না।
