সম্পাদকীয়

রংপুরের বন সংকট ও পরিবেশ বিপর্যয়ের হুমকি

রংপুর অঞ্চলের বনভূমি ও বৃক্ষ-সম্পদ আজ এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। জাতীয় ও বৈশি^ক পরিবেশ নীতিতে যেখানে ভূমির অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা অপরিহার্য বলে বিবেচিত, সেখানে রংপুরে সরকারি বনভূমি রয়েছে মাত্র ১ শতাংশেরও কম। বেসরকারি পর্যায়ে গাছপালা রয়েছে আরও কিছুটা বেশি-তবে সেটিও ১১ শতাংশের ঘরে সীমাবদ্ধ। এই অপ্রতুলতা শুধু পরিসংখ্যানগত নয়; এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য, জলবায়ু, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। বনের সংকোচন রংপুর অঞ্চলের জলবায়ুকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত করছে। খরার প্রবণতা বাড়ছে, নদী-নালার পানি শুকিয়ে যাচ্ছে, শীত কমছে, গরম বাড়ছে এবং উপকূলীয় নয় এমন এই অঞ্চলেও মরুকরণের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই সবকিছুর কেন্দ্রে রয়েছে বৃক্ষনিধন, যেটি ঘটছে পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকা-, নগরায়ণ ও অবৈধ দখলদারির কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘তিস্তা সেচ প্রকল্প’-এর কাজের অজুহাতে লক্ষাধিক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। পরিকল্পনায় প্রতিস্থাপন থাকলেও বাস্তবে তার কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে, সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই অনিশ্চিত। রংপুর বিভাগে সরকারি বনভূমির একটি বড় অংশই এখন অবৈধ দখলদারদের কবলে। স্থানীয় প্রভাবশালী মহল বছরের পর বছর এই জমি ভোগ করে আসছে, অথচ বন বিভাগের মামলাগুলো আইনের দীর্ঘসূত্রিতায় পড়ে থেমে আছে। প্রশাসনিক সদিচ্ছা ও সমন্বয়ের অভাবের ফলে বনভূমি উদ্ধার কার্যক্রম কার্যকর হচ্ছে না। এর ফলে সরকারি বনায়ন কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। বনভূমির সংকট শুধু পরিবেশ নয়, জনজীবনকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে। বাতাসে অক্সিজেনের ঘাটতি, গরমের তীব্রতা বৃদ্ধি, রোগব্যাধির বিস্তার-সব মিলিয়ে মানুষের জীবনমান ক্রমেই নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের ওপর এই প্রভাব আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এই সংকট নিরসনে শুধু বন বিভাগের অভিযানে সমাধান আসবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সামাজিক উদ্যোগ এবং আইনি কার্যকারিতার সমন্বয়। বনভূমি পুনরুদ্ধার, সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন কর্মকা-ে পরিবেশগত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। উন্নয়নের নামে বৃক্ষনিধনের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে এবং যে জমিগুলো বছরের পর বছর খালি পড়ে আছে, সেখানে বনায়নের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। রংপুরের এই সংকট ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই যদি সচেতন, দায়িত্বশীল ও কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে একদিন এই জনপদ রূপ নেবে এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হওয়া অঞ্চলে। বন নয়, প্রকৃতপক্ষে মানুষকেই বাঁচাতে হবে বনকে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button