উচ্চ রক্তচাপ: নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই শ্রেষ্ঠ প্রতিকার

বাংলাদেশসহ সারা বিশে^ উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন একটি নীরব ঘাতক হিসেবে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৩ কোটির বেশি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। ভয়ংকর বিষয় হলো, আক্রান্তদের ৫৯ শতাংশ জানেনই না যে তারা এ রোগে আক্রান্ত। আবার অনেকেই জানার পরও চিকিৎসা নিচ্ছেন না কিংবা নিয়মিত ওষুধ সেবন করছেন না। স্বাস্থ্যবিধির প্রতি এই অবহেলা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ^জুড়ে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপজনিত কারণে মারা যাচ্ছেন। বাংলাদেশেও এই রোগ কিডনি বিকল, স্ট্রোক ও হৃদরোগের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান সঠিকভাবেই এটিকে ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কারণ, অনেক সময় এটি কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে ধীরে ধীরে ক্ষতি করতে থাকে। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ (২০১৭-১৮) বলছে, দেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সি ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। নারী আক্রান্তের হার পুরুষের তুলনায় বেশি। উচ্চ রক্তচাপ থাকা সত্ত্বেও অনেকেই নিয়মিত রক্তচাপ মাপেন না, চিকিৎসকের পরামর্শ নেন না এবং ওষুধও খান না। ওষুধের পাশর্^প্রতিক্রিয়া, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা বা ধারাবাহিক চিকিৎসার গুরুত্ব না বোঝা-এই কারণগুলো মানুষকে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই বাস্তবতায় ‘বিশ^ উচ্চ রক্তচাপ দিবস’-এর এ বছরের প্রতিপাদ্য-‘রক্তচাপ সঠিকভাবে মাপুন, নিয়ন্ত্রণ করুন, দীর্ঘজীবী হোন’-শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং এটি একটি জরুরি সতর্কবার্তা। বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ নির্ণয় ও চিকিৎসায় সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষার সুযোগ রয়েছে। তবে রোগীর তুলনায় এই সুযোগের পরিধি ও গভীরতা এখনও যথেষ্ট নয়। প্রশংসনীয় উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন পরিচালিত কর্মসূচি, যার মাধ্যমে দেশের ৩১০টি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত ও চিকিৎসা কার্যক্রম চালু রয়েছে। ইতোমধ্যে এই কর্মসূচিতে ৮ লাখের বেশি রোগী নিবন্ধিত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৫৫ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই কার্যক্রমে প্রশিক্ষিত কর্মীরা শুধু রক্তচাপ মাপাই করছেন না, বরং জীবনধারা পরিবর্তনের পরামর্শ, চিকিৎসকের কাছে রেফার এবং ওষুধ ব্যবস্থাপনাও করছেন। এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও, এটি এখনও দেশের সামগ্রিক চাহিদার তুলনায় সীমিত। এখন প্রয়োজন একটি আরও বিস্তৃত, শক্তিশালী এবং সমন্বিত কৌশল। সচেতনতা বাড়ানো, নিয়মিত রক্তচাপ মাপার অভ্যাস গড়ে তোলা, ওষুধ সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা, এবং খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণে পরিবর্তন আনা-এই চারটি স্তম্ভের ওপর একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
