ডেঙ্গুর বড় ঢেউ আসছে : দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে

দেশজুড়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। গত মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আরো তিনজন মারা গেছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫১২ জন। চলতি বছর মশাবাহিত এই রোগে মৃত্যু হয়েছে ৪৭ জনের, যার মধ্যে ২৯ জনই মারা গেছে চলতি জুলাই মাসে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর বড় ঢেউ আসছে বলে সতর্ক করেছে বিশেষজ্ঞমহল। দেশের বিভিন্ন স্থানে ডেঙ্গু মাথাচাড়া দিয়েছে। চট্টগ্রামের অবস্থা বেশ নাজুক। সেখানে প্রায় এক মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বেড়েছে ১৭৪ শতাংশ। হাসপাতালে শয্যা না পেয়ে রোগীরা মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছে। খবরে বলা হয়েছে, চলতি বছর এরই মধ্যে দেশের ৬৪ জেলায়ই ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৪ শতাংশ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার, আর বাকি ৭৫ শতাংশই ঢাকার বাইরের। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া যাচ্ছে বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, কুমিল্লা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে রাজধানীর মতো নগরকেন্দ্রিক এই রোগটি কয়েক বছরের মধ্যে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, এবার ডেঙ্গু ও হাম এই দুই রোগের একসঙ্গে বিস্তার ঘটায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। তাই মশা নিয়ন্ত্রণ, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং জেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা শক্তিশালী না করলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এখন থেকে প্রতিদিনই রোগী বাড়বে এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। এবার ঢাকার তুলনায় ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেই সংক্রমণ বেশি হবে। কিন্তু সেসব এলাকার রোগীরা চিকিৎসার জন্য ঢাকায় এলে দীর্ঘ যাত্রাপথে তাদের শারীরিক অবস্থা আরো জটিল হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে লার্ভা ধ্বংস এবং প্রমাণ ও লক্ষ্যভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়। পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও ওষুধ ছিটানো, ফগিং মেশিনের মতো কর্মসূচিগুলো বাস্তবভিত্তিক সমাধানের চেয়ে প্রচারমুখী ও আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকছে। এতে মশার লার্ভা এবং প্রজননস্থল ধ্বংসকরণে স্থায়ী কোনো সফলতা আসছে না। এ কারণে ডেঙ্গুর বিস্তারও রোধ করা যাচ্ছে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, রাজধানীর মতো বড় শহরে মশা নিধনে কিছু কর্মকা- চোখে পড়লেও মফস্বল শহরগুলোতে একেবারেই নেই। এটিই সবচেয়ে উদ্বেগেরÑঢাকার বাইরে রোগী বেশি, কিন্তু সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নেই। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলে আসছেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি রোগ নয়। এটি এখন বারোমাসি বা স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। কাজেই এখন বর্ষাভিত্তিক কর্মসূচির চেয়ে প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত উদ্যোগ। গ্রাম ও শহর সর্বত্র এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে একযোগে কাজ করতে হবে। আশা করছি, আগস্ট-সেপ্টেম্বরে বড় ঢেউ আসার আগেই সরকার দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
