চার বছর পর খালিশপুরে চাঞ্চল্যকর কলেজ ছাত্র হাসিব হত্যায় ২১ জনের যাবজ্জীবন

রায়ে বাদী পক্ষের অসন্তুষ্টি, আপিলের জন্য সম্মতি প্রকাশ
স্টাফ রিপোর্টারঃ চার বছর ২মাস ৩ দিন পর নগরীার খালিশপুর হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজের বহুল আলোচিত কলেজ ছাত্র হাসিবুর রহমান নিয়াজ হত্যা মামলায় ২১ জনের আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছেন আদালত। একইসাথে তাদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে আরও ৬ মাসের সশ্রম কারাদ- প্রদান করা হয়েছে। মঙ্গলবার খুলনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত-৩ এর বিচারক আঃ ছালাম এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওই আদালতের সরকারি আইনজীবী(এপিপি) রোমানা তানহা ও বাদীর আইনজীবী স্বপন কুমার দাস। সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন কবির হোসেনের ছেলে সৈকত(৩২), রুনু হাওলাদারের ছেলে মেহেদী হাসান রাব্বি (২২), আওয়ামী লীগ নেত্রী শারমীন রহমান শিখার ছেলে মহানগর স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা রওশন আনিজি অন্তু (৩৩), নুরু ওরফে কানা নুরুর ছেলে সাজ্জাদ হোসেন (২২), শাহিন আলম সেন্টুর ছেলে ইমদাদুল ইসলাম হৃদয় (২২), আমির খানের ছেলে আরিফ ওরফে চোরা আরিফ (২৯), আমির খানের ছেলে মো. মুন্না (২৩), আমিন উদ্দীনের ছেলে রফিকুল হাসান শাওন ওরফে আতাং বাবু (২৯), ফখরুল ইসলামের ছেলে সাইফুল ইসলাম (২৮), সিদ্দিকের ছেলে মোস্তাক আহমেদ (৩০), মাইকেল সরদারের ছেলে মিঠাই হৃদয় (২৯), মো. শাকিলের ছেলে ফাইম ওরফে কালা ফাইম (২২), চুন্নুর ছেলে রুবেল (২৮), কুদ্দুসুর রহমানের ছেলে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মো. ফয়েজুর রহমান আরাফাত (৩২), বাহারুল ইসলামের ছেলে সবুজ (২৮), জাকির হোসেনের ছেলে রাব্বী ওরফে নাটা রাব্বী (২৮), বেল্লাল হোসেনের ছেলে ইয়াসির রাব্বী ওরফে নাটা জুয়েল (২৬), নাজমুল শেখের ছেলে সাকিব শেখ (২৫), আব্দুর রহমানের ছেলে নাইমুর রহমান ফাইম (২৪), সিরাজুল ইসলাম নান্নুর ছেলে আশিকুর রহমান তুষার (২৬), নাঈমুর রহমান ফাহিম (৩০)। এর মধ্যে পলাতক রয়েছে ৯ জন। তারা হলো, মিঠাই হৃদয়, নাটা রাব্বি, মুস্তাক, ইমদাদুল ইসলাম হৃদয়, মুন্না, কালা ফাইম, চোরা আরিফ, মেহেদী হাসান রাব্বী ও সৈকত। এছাড়া খালাসপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, মো. তুষার, রায়হান, রুনু হওলাদার, নাইম বাবু ওরফে পয়েন্ট বাবু, সালমান। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, হাসিব হত্যার ঘটনায় ২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মিজানুর রহমান ২৭ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন। গত ২৪ ডিসেম্বর ওই একই আদালতে চার্জশীটের ওপর শুনানি শেষে আদালত তা আমলে নিয়ে আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেন। গত ৭ মার্চ থেকে কলেজ ছাত্র হাসিবুর রহমান নিয়াজ (২৫) হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। পরে নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ না হওয়ায় আদালত মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বদলী করে। সেই আদালতে বিচার কার্যক্রম শেষ হলো। বাদী জানান, হাসিব হত্যা মামলার আসামি সাকিব ও ফাহিমসহ তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তবে মামলার আসামী ইথুনের বয়স কম হওয়ায় তার বিচার হবে শিশু আদালতে বিচার হয়। সে রায়ে খালাস পায় বলে বাদীর স্বজনরা জানান। বাদীর আইনজীবী স্বপন কুমার দাস বলেন, মঙ্গলবার খুলনা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩ এ রায় ঘোষণা করা হয়। যার জিআর নং-১৮৮/২০। এ মামলায় আসামী মোট ২৬ জন। এর মধ্যে ১২ জন কারাগারে রয়েছে। বাকীরা পলাতক রয়েছে। এ মামলায় স্বাক্ষী হয়েছে ২৭ জনের। এ মামলাটি বাদীর জন্য একটি ভাল মামলা ছিল। মামলায় তিন জন আসামীর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। লোকহর্ষক খুনের ভিডিও রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে হাসিবকে খুন করা হয় বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন। স্বাক্ষী আর প্রমাণ যা ছিল তাতে ৩/৪ জন আসামীর ফাঁসির আদেশ হওয়ার মত ছিল বলে তিনি মনে করেন। নিহত হাসিবের পিতা হাবিবুর রহমান বলেন, এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট না। ভেবেছিলাম কয়েকজন আসামির ফাঁসি হবে। আমরা হাইকোর্টে আবেদন করবো। একই কথা বলেন, নিহতের বন্ধু জোবায়ের। তিনি বলেন, খুনের ভিওি, তিন জনের ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী, পরিকল্পিত হত্যার প্রতিবেদনসহ নানা দিক থাকার পরও আদালত আসামীদের ফাঁসি আদেশ দেয়নি। ন্যায় বিচারের স্বার্থে তারা উচ্চ আদালতে যাবেন বলে তিনি জানান। আদালতের সরকারি কোঁসুলি রোমানা তানহা বলেন, খালিশপুরের চাঞ্চল্যকর হাসিবুর রহমান হত্যা মামলায় দীর্ঘ বিচার কাজ শেষে আদালত রায় দিয়েছেন। রায়ে ৫ জন আসামি খালাস পেয়েছেন। বাকী আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তাদের ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৬ মাসের কারাদন্ড দিয়েছেন। আদালত অবশ্যই সম্পূর্ণ বিচার করেই রায় দিয়েছেন। কিন্তু আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট নয়। আমরা কাগজপত্র তুলবো। মামলার বাদীর সঙ্গে কথা বলে হাইকোর্টে আবেদন করবো।তিনি আরও বলেন, ‘মামলার বিচার চলাকালে জীবনের নিরাপত্তার অভাববোধ করে মামলার বাদী ও নিহতের বাবা হাবিবুর রহমান শিকদার বিভিন্ন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। তারপরও তিনি নিরাপত্তার অভাবে খুলনায় থাকতে পারেননি। গত চার বছর ধরে তিনি বরিশাল থেকে খুলনায় মামলার তারিখের দিন আসতেন ও চলে যেতেন। এর আগে আসামি অন্তু আর আরাফাত স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহানগর কমিটিতে স্থান পাওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাদের ভয়ে বাদী এলাকাছাড়া হন।’ উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ১৯ আগস্ট রাত ৯ টার দিকে এলাকার মাদক বিক্রির প্রতিবাদ করাকে কেন্দ্র করে খালিশপুর ওয়ান্ডারল্যান্ড শিশু পার্ক সংলগ্ন ক্রিয়েটিভ কার্টস এ্যন্ড কফি হাউজের মধ্যে একদল সন্ত্রাসী ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুন করে তৈয়্যেবা কলোনীর বাসিন্দা ও মিল শ্রমিক মো. হাবিবুর রহমানের ছেলে কলেজ ছাত্র হাসিবুর রহমান নিয়াজকে। এ সময় তাকে বাঁচানোর জন্য দু’ বন্ধু যোবায়ের ও রানা এগিয়ে এলে তাদেরও কুপিয়ে জখম করা হয়। হত্যাকান্ডের ভিডিও ফুটেজ ভাইরাল হয়। এ ব্যাপারে নিহতের পিতা হাবিবুর রহমান ঘটনার পরের দিন বাদী হয়ে খালিশপুর থানায় মামলা দায়ের করেন।



