সুন্দরবন রক্ষার্থে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল দাবি

কৃষি-শিল্প কমিটির প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকপিলি পেশ
স্টাফ রিপোর্টারঃ সুন্দরবন দিবস উপলক্ষ্যে কৃষি-শিল্প-পাট ও পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক কমিটির উদ্যোগে নাগরিক পদযাত্রা বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় নগরীর শহীদ হাদিস পার্ক থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে এসে শেষ হয়। এখানে কমিটির উদ্যোগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন নাগরিক কমিটির সভাপতি এ্যাড. কুদরত-ই-খুদা এবং সাধারণ সম্পাদক সুতপা বেদজ্ঞ। সমাবেশ শেষে খুলনার জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল ইসলামের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টা এবং খুলনার বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো এর মাধ্যমে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপিতে বলা হয়, প্রকৃতির অকৃত্রিম দান প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বিশ^ ঐতিহ্য সুন্দরবন বাংলাদেশের ফুসফুস। জন্মলগ্ন থেকেই বনের পাশে বসবাসকারী বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে এই বন উজাড় করে দিয়ে যাচ্ছে তার সম্পদ। সুন্দরবনকে ঘিরে নানা প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য সৃষ্টি হয়েছে এক বৈচিত্র্যময় পরিবেশ ও প্রতিবেশ। সুন্দরবন নিজের বুককে ক্ষত-বিক্ষত করে বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা প্রবল থেকে প্রবলতর ঘুর্ণিঝড়-জলোচ্ছাসের হাত থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলবাসীকে রক্ষা করে চলেছে। সুন্দরবনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে পর্যটন শিল্পসহ নানা শিল্প। সরকার এখান থেকে বিপুল পরিমাণে রাজস্ব পেয়ে থাকে অথচ সুন্দরবনের জন্য আলাদা কোনো যতেœর ব্যবস্থা নেই। সুন্দরবনের পাশেই গড়ে তোলা হয়েছে প্রকৃতি বিধ্বংসী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘন করে আশে-পাশে গড়ে উঠেছে ভারী শিল্প-কারখানা। নদীতে বিষ ঢেলে শিকার করা হচ্ছে মাছ। পর্যটকেরা প্লাস্টিকসহ নানান বর্জ্য বন ও বনসংলগ্ন নদীতে ফেলছে। বনবিভাগের কর্মকর্তাদের নজরদারি যথেষ্ট নয়। এভাবে চলতে থাকলে নিকট ভবিষ্যতেই সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে, সাথে সাথে তলিয়ে যাবে এ অঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন কৃষি জমি ও বসত ভিটা। ইতিমধ্যে এ ধরনের আলামত শুরু হয়েছে। বনের উপকূলবর্তী বেশ কিছু এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। প্রতিটি জলোচ্ছাস ও ঘুর্ণিঝড়ের পরে কিছু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে। স্মারকলিপিতে আরো বলা হয়, ২০২২ ও ২০২৩ সালে বহুল আলোচিত পরিবেশ বিধ্বংসী রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি ইউনিট চালু হওয়ার পর যান্ত্রিক ত্রুটি ও কয়লা সংকটে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ বার বন্ধ হয়েছে। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, কয়েক বছর আগে মাছ থাকলেও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য পানিতে ছড়িয়ে পড়ায় নদীতে মাছ কমতে শুরু করেছে। এ ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের কারণে চারণভূমির পরিমান কমে গেছে, এতে গবাদি পশু পালন কঠিন হয়ে পড়েছে। জীবিকার একটি বড় ক্ষেত্র নষ্ট হয়ে গেছে, বাধ্য হয়ে দূর-দূরান্তে কাজে যেতে হচ্ছে গ্রামবাসীকে। সিইজিআইএস এর গবেষণা রিপোর্ট অনুযায়ী কয়লা পরিবহনে দূষিত হচ্ছে সুন্দরবন এলাকার নদী ও বন। শর্ত ভঙ্গ করে জেটি থেকে উন্মুক্তভাবে খালাস করা কয়লা সরাসরি পড়ছে নদীতে এবং নির্গত পানি পরিশোধন ছাড়াই মিশছে প্রকৃতিতে। এলাকায় বাড়ছে নাইট্রেট, ফসফেস, পারদসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিকের মাত্রা। এতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে জলজ ও বনজ জীববৈচিত্রের ওপর। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল করার পক্ষে বাংলাদেশে শক্তিশালী জনমত রয়েছে। এই বাস্তবতায় সুন্দরবন বাচাঁতে আমরা দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের নাগরিকবৃন্দের পক্ষে ‘কৃষি-শিল্প-পাট ও পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক কমিটি’ সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি সুবিবেচনা ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পেশ করেছে। দাবিনামা নি¤œরূপঃ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিকল্প আছে কিন্তু সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই। তাই সুন্দরবন ধ্বংসকারী ‘রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র’ অবিলম্বে বন্ধ, বাংলাদেশের ফুসফুস সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয় বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখা, সুন্দরবন বাঁচাতে এখনই বনের ১০ কি.মি মধ্যে ভারী শিল্প স্থাপনা নিষিদ্ধসহ পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকার(ইসিএ) নীতিমালার বাস্তবায়ন, সুন্দরবনে যারা বিষ দিয়ে মাছ ধরছে দ্রুত তদন্ত করে সেইসকল অপরাধীদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা এবং খুলনায় একটি পরিবেশ আদালত স্থাপন, সুন্দরবন ও সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা করতে পরিবেশ বান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করা, সুন্দরবন রক্ষায় যুগোপযোগী ও বাস্তবভিত্তিক ‘সুন্দরবন রক্ষায় বিশেষ আইন’ তৈরি এবং বিশ^ ঐতিহ্য সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয়ভাবে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণা করা। স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন, উপদেষ্টা বীরমুক্তিযোদ্ধা এ্যাড. আ, ফ, ম মহসীন, ডাঃ মনোজ দাশ, গাজী নওশের আলী, এ্যাড. তসলিমা খাতুন ছন্দা, সহ সভাপতি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এস এ রশীদ, মুনীর চৌধুরী সোহেল, মোঃ মোজাম্মেল হক খান, মাহফুজুর রহমান মুকুল, যুগ্ম সম্পাদক এস এম চন্দন, কোষাধ্যক্ষ প্রাণীপ্রেমী এস এম সোহরাব হোসেন, দপ্তর সম্পাদক আফজাল হোসেন রাজু, সদস্য মতিয়ার রহমান, সরদার আবু তাহের, ইকবাল হাসান তুহিন, সাংবাদিক এইচ এম আলাউদ্দীন, শরিফুল ইসলাম সেলিম, কাজী জাভেদ খালিদ পাশা, গাজী আফজাল হোসেন, কবি নাজমুল তারেক তুষার, মাজেদা খাতুন, সামিমা আক্তার জুই প্রমুখ।



