নগরীতে দু’ শিশু ও নানীসহ এক রাতেই চার খুন

স্ত্রী’র সামনেই স্বামীকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা
ছেলেকে হাফেজ হয়ে আমার জানাযা পড়াবে- এখন আমি কি নিয়ে বাঁচবো : মায়ের আহাজারি
শেখ ফেরদৌস রহমান : নগরীতে দু’ শিশু ও নানীসহএক রাতেই চারজনকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। রোববার সন্ধ্যার পর নগরীর ৩১নংওয়ার্ডের কমিশনারের কালভার্ট এলাকায় দু’ শিশু ও নানীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার রাত সাড়ে ৭টার দিকে স্থানীয় দরবেশ মোল্লার গলিতে নিজ বাড়ির মুরগির খামারের ভূসির ঘর থেকে ৩টি লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে কি কারণে কে বা কারা তাদের হত্যা করেছে- সে বিষয়ে পুলিশ ও স্থানীয়রা কিছুই বলতে পারেনি। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
অপরদিকে, রোববার রাতে একই সময় নগরীর সোনাডাঙ্গা থানাধীন বয়রা করিম নগর এলাকায় আলাউদ্দিন মৃধা (২৫) নামে এক যুবককে তার স্ত্রী’র সামনেই গুলি ও জবাই করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। খুলনা মহানগরীর সোনাডাঙ্গা থানাধীন করিম নগর সৈয়দ আলী হোসেন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন জামাই পাড়া এলাকায় হত্যাকান্ডটি ঘটে। নিহত আলাউদ্দিন একই এলাকার মনা মুন্সির ছেলে। সে ফেরী করে ডিম বিক্রি করত।পাশাপাশি এলাকায় জমি কেনা বেচার সাথে জড়িত ছিল বলে জানা গেছে।
দু’ শিশু ও নানী খুন : নগরীর লবণচরা থানাধীন ৩১ নং ওয়ার্ডের কমিশনারের কালভার্ট এলাকায় দু’ শিশু ও নানীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার রাত সাড়ে ৭টার দিকে স্থানীয় দরবেশ মোল্লার গলিতে নিজ বাড়ির মুরগির খামারের ভূসির ঘর থেকে ৩টি লাশ উদ্ধার করা হয়। তবে কি কারণে কে বা কারা তাদের হত্যা করেছে- সে বিষয়ে পুলিশ ও স্থানীয়রা কিছুই বলতে পারেনি। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। নিহতরা হচ্ছে- নানী সাহিতুনন্নেছা (৬০) এবং নাতি মো. মুস্তাকিম (৯) ও নাতনি সাফিয়া খাতুন (৮। লবণচরা থানার অফিসার ইনচার্য হাওলাদার সানোয়ার হুসাইন মাছুমবিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে, নিহত দু’ শিশুর মা এবং বৃদ্ধার কন্যা রুবিয়া বেগমের আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে। দু’ শিশু সন্তান এবং তার বৃদ্ধা মায়ের নানা স্মৃতি আওড়িয়ে তিনি বিলাপ করছেন।
লবণচরা থানার অফিসার ইনচার্জ হাওলাদার সানোয়ার হুসাইন মাছুম বলেন, নগরীর জিন্নাপাড়া মুক্তার কালভার্ট এলাকার বাসায় থাকতেন স্বামী সেফায়েত আহমেদ মুন ও তার স্ত্রী রুবিয়া বেগম। তারা দুজনই চাকরিজীবী। তারা দু’জনই অফিসে বের হয়ে যান সকালে। পরবর্তিতে সন্ধার পর বাসায় ফিরে দেখেন ঘর বাইরে থেকে আটকানো। ঘরে প্রবেশ করে তিনজনের মরদেহ দেখতে পেয়ে তারা পুলিশকে খবর দেন।
ওসি বলেন, তাদেরকে ভারি কোন বস্তু দিযে আঘাত করে হত্যা করা হতে পারে। দেয়ালে রক্তের দাগ দেখা গেছে। তদন্ত চলছে বিস্তারিত পরে জানা যাবে।
এদিকে নিহত দু’ শিশুর মা রুবিয়া বেগম বলেন, আমি অফিসে যাওয়ার সময়ে সকাল আটটায় আমার বাচ্চাদের সাথে শেষ কথা হয়েছে। দুপুরের পর ঘটনাটি ঘটতে পারে। আমি একাই এই বাড়ী থাকতাম। আশেপাশে অন্য কোন পরিবার নেই। কেন কিভাবে হলো আমি বলতে পারছিনা।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি এখন কি নিয়ে বাঁচবো । এই দুনিয়ায় আমার আর কেউ নেই। আমি আমার ছেলে মুস্তাকিমকে মাদরাসায় পড়াচ্ছিলাম। সে হাফেজ হয়ে আমার জানাযা পড়াবে। কিন্তু এখন আমার দুনিয়ায় বেঁচে থাকা না থাকা সমান। আমার ভাই-বোনকে আমি কি জবাব দিব’ ইত্যাদি বলে বিলাপ করছিলেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাড়ির মালিক শিফায়েত আহাম্মেদ ও তার স্ত্রী রুবিয়া আক্তার বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) অফিসে চাকরি করেন। রাতে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফিরে নিজ গেটের সামনে ডাকাডাকি করেও ঘরের ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে বাইরের তালা খুলে ঘরে প্রবেশ করেন। ঘরে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান-সামনের দরজা ও পাশের দরজা বন্ধ অবস্থায় আছে। পরবর্তীতে হাঁস-মুরগির খোপের দিক থেকে তালাবদ্ধ দেখতে পেয়ে তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন।এসময় তিনি তার মা মহিদুন্নেসা (৫৫), খুলনা এবং তার দুই সন্তান মোস্তাকিম ও ফাতিহা আহমেদ এর মৃতদেহ মুরগির খোপের ভিতরে পড়ে থাকতে দেখেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি উচ্চস্বরে চিৎকার করলে আশপাশের প্রতিবেশীরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং তাৎক্ষণিকভাবে রূপসা থানা পুলিশকে খবর দেন।
স্ত্রী’র সামনেই স্বামীকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা : নগরীর সোনাডাঙ্গা এলাকায় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে স্ত্রীর সামনে এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যায় খুলনা মহানগরীর করিমনগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম আলাউদ্দিন মৃধা (৩৫)। তিনি একই এলাকার মনা মুন্সির ছেলে। তিনি করিমনগরের ইলোরা বেগমের বাড়িতে ভাড়াটিয়া ছিলেন।
সোনাডাঙ্গা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুমন হাওলাদার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, করিমনগর এলাকার সংলগ্ন সৈয়দ আলী হোসেন স্কুলের কাছে সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঘটনাটি ঘটে।
তিনি বলেন, আলাউদ্দিন এবং তার স্ত্রী তাদের ভাড়া বাড়ির সিঁড়িতে বসে ছিলেন। ঠিক তখনই ছয় থেকে সাতজন দুর্বৃত্ত তাদের বাড়িতে প্রবেশ করে এবং তার সাথে কথা বলতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা তাকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। দুটি গুলি তার বুকে এবং পেটে লাগে। পরে তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার গলা কেটে ফেলে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনটি খালি গুলির খোসা উদ্ধার করেছে। আরও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ফৌজদারি তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কে অবহিত করা হয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তা এসআই সুমন আরও বলেন, নিহত ব্যক্তির পূর্বে মাদক-সম্পর্কিত কর্মকা-ে জড়িত থাকার রেকর্ড ছিল। মাদক মামলায় তিনি জেল খেটেছিলেন। প্রায় দশ দিন আগে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান এবং তখন থেকে দিনমজুর হিসেবে কাজ করছিলেন বলে জানা গেছে। হত্যার পেছনের উদ্দেশ্য তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি, তদন্ত চলছে।
নিহত আলাউদ্দিনের বোন আফিদা খানম বলেন, আমার ভাই একটি মাদক মামলায় কারাগারে ছিল। গত ১০ দিন আগে সে বের হয়েছে। তবে কি কারণে কারা তাকে খুন করেছে- এখন আমরা তা বলতে পারছিনা।
নিহতের নিহতের স্ত্রী জানান, ৫/৬জন যুবক ৩টি মটর সাইকেলে করে তাদের বাসার বাউন্ডারির মধ্যে প্রবেশ করে। এ সময়ে তারা আলাউদ্দিন মৃধা কে ডেকে পিছন দিক থেকে জাপটে ধরে এবং তাদের কাছে থাকা অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় তিন রাউন্ড গুলি করে ও মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য ধারালো চাপাতি দিয়ে জবাই করে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পুলিশ জানায়, নিহত আলাউদ্দিনের বড় ভাই জালাল এক সময় খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও খুলনা মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ শাহজালাল সুজনের আস্থাভাজন ছিল, তবে তার কোন পদ-পদবী ছিল না। নিহত আলাউদ্দিন এক সময় সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ছিল বলে প্রাথমিক ভাবে জানা যায়।
এ বিষয়ে কেএমপি’র উপ কমিশনার (দক্ষিন) সুদর্শন কুমার রায় বলেন, প্রাথমিক ভাবে জানাগেছে আলাউদ্দিনকে হত্যার পিছনে পূর্ব কোন শত্রুতা থাকতে পারে।তদন্ত চলছে। এছাড়া সিআউডি সহ পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামত সংগ্রহ করেছে। লাশ মর্গে নেয়ার প্রস্তুতি চলছে।



