খুলনাঞ্চলে প্রবীণ-প্রতিবন্ধী নারীরাও হচ্ছে স্বাবলম্বী

তিন জেলায় দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে এসডিডিবি প্রকল্প
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা বিভাগের তিন জেলার ২ হাজার প্রবীন ও প্রতিবন্ধী নারীদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে প্রবীণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প (এসডিডিবি)। উল্লিখিত জেলাগুলোর তিনটি উপজেলা এবং তিনটি ইউনিয়নের তৃণমূল পর্যায়ে সুবিধা বঞ্চিত প্রতিবন্ধী নারীদের সচেতন করে তোলা হচ্ছে। জার্মান ও বিএমজেড’র অর্থায়নে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কারিতাস খুলনা অঞ্চল এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের আওতায় প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী নারীদের দক্ষতা উন্নয়নে কমিউনিকেশন, টেইলারিং, গরু মোটাতাজাকরণ ও হস্তশিল্পসহ দেওয়া হচ্ছে নানা বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও। এসব প্রশিক্ষণ পেয়ে সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীরা কথা বলতে শিখছে, জানতে পারছে তাদের অধিকার সম্পর্কে।
এদিকে, এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) কারিতাস খুলনার আঞ্চলিক কার্যালয়ে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী নারীদের দক্ষতা উন্নয়নে দু’দিন ব্যাপী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়। এ প্রশিক্ষণে তিনটি ইউনিয়নের নারী ফোরামের নেত্রীসহ মোট ১৪জন প্রতিবন্ধী নারী অংশ নেন।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া মোংলা চাঁদপাই ইউনিয়নের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী চৈতি পাড়ই বলেন, তিনি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ নিয়ে বাড়িতে হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন করছেন। এতে মায়ের সঙ্গে থেকে তিনিও সংসারে ভূমিকা রাখছেন।
যশোরের ঝিকরগাছার শিমুলিয়া ইউনিয়নের প্রতিবন্ধী আয়শা বেগম বলেন, তিনিও হাঁস-মুরগি পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নের দশম শ্রেণির ছাত্রী শারীরিক প্রতিবন্ধী জান্নাতুল ফেরদাউস বলেন, তার হাত ও পায়ে সমস্যার কারণে স্কুলে যাওয়া-আসার সময় অনেকেই তাকে দেখে হাসাহাসি করতো। এতে সে ভয়ে বাড়িতে লুকিয়ে থাকতো। কিন্তু এই প্রকল্পের প্রশিক্ষণ নিয়ে এবং তারমত অনেক প্রতিবন্ধীদের জীবন-সংগ্রাম দেখে তার ভয় কেটে গেছে। এখন সে উৎসাহ পেয়ে পড়া-লেখাসহ স্বাভাবিক ভাবেই সকল কাজ করতে পারছে।
মোংলার চাঁদপাই ইউনিয়ন নারী ফোরামের সভানেত্রী শারীরিক প্রতিবন্ধী রেখা কর্মকার বলেন, তিনি ২০১৮ সাল থেকে এসডিডিবি প্রকল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছেন। আগে অনেক কিছুই জানতেন না। কিন্তু প্রকল্প থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন অনেক কিছুই শিখেছেন। নেতৃত্ব দিচ্ছেন ১৫ সদস্যের নারী ফোরামের। বিশেষ করে পাট দিয়ে হস্তশিল্প তৈরি করে তিনি জয়ীতা অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। সদস্যদেরও ট্রেণিং দিয়ে প্রশিক্ষিত করছেন। তবে, কোন শো-রুম না থাকায় তাদের তৈরি হস্তশিল্প বাজারজাত করতে পারছেন না। তাদেরমত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূল স্্েরাত ধারায় অন্তর্ভূক্তির মাধ্যমে উন্নয়ন কাজে অংশ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি এবং তাদের পূর্ণ অধিকারসহ জীবন মান উন্নয়নে বাজেটে বরাদ্দ রাখার দাবি জানান তিনি।
কারিতাস খুলনা অঞ্চলের জুনিয়র প্রকল্প কর্মকর্তা রবীন রবার্ট গোলদার জানান, ২০০৫ সাল থেকে খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার চাঁদপাই ইউনিয়ন, যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়ন এবং চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা ইউনিয়নে এসডিডিবি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ইতিমধ্যে প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় ফেজের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে তৃতীয় ফেজের কাজ চলমান রয়েছে। যা ২০১৬ সাল থেকে শুরু হয়ে আগামী ২০২৭ সালে শেষ হবে।
তিনি বলেন, প্রথমে গ্রাম পর্যায়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন, উপজেলা এবং বর্তমানে জেলা পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রকল্প এলাকার প্রতিটি ইউনিয়নে ৮টি করে মোট ২৪টি ক্লাব রয়েছে। এভাবে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী নারীদের খুঁজে বের করে সংগঠিত করে সচেতনতা তৈরি এবং প্রশিক্ষিত করে তোলা হচ্ছে। মূলত: কাউকে বাদ দিয়ে নয়, সমাজের সকলকেই উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগ করে দিতে হবে। প্রবীণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমন্বিত উন্নয়নের মাধ্যমই সমাজ তথা দেশেরও উন্নয়ন হবে বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।
এ বিষয়ে কারিতাস খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক আলবিনো নাথ বলেন, ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করছে কারিতাস বাংলাদেশ। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন মান উন্নয়নে কারিতাস খুলনা অঞ্চল বিভিন্ন ধরণের প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, এসডিডিবি প্রকল্প তারমধ্যে অন্যতম। কারিতাস গ্রামের অবহেলিত পরিবেশ থেকে প্রবীন ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্রমান্বয়ে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা এবং বিভাগীয় বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংযোগকরণের মধ্য দিয়ে মূলস্রোত ধারায় একত্রিকরণ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের চেষ্টা করছে। প্রবীন ও প্রতিবন্ধী ক্লাবগুলো রেজিষ্ট্রেশন পাওয়ার মধ্য দিয়ে নিজেরাই আরো ব্যাপক আকারে কাজ করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি। তাই এই বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।


