ইজিবাইকে অতিষ্ট নগরবাসি : শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগ কাগজে কলমে

# কোন ধরণের ড্রাইভিং দক্ষতা ছ্ড়াাই দেয়া হয়েছে লাইসেন্স
# চালকদের খামখেয়ালিপনায় ঘটছে দুর্ঘটনা
# বেশিরভাগ চালক জানেনা ট্রাফিক নিয়ম
# অভিযান চালাতে কেসিসির সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ কেএমপি’র।
কামাল মোস্তফা ঃ সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণে খুলনা সিটি করপোরেশন(কেসিসি) ও খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উদ্যোগে সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও রুট নির্ধারণ আটকে আছে কাগজে কলমেই। এজন্য জনবল সংকটকে দায়ী করছেন কর্তৃপক্ষ। ৫ আগস্টের পর থেকে দুই দফায় উদ্যোগ নেয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। মাইকিং, লিফলেট বিতরণ আর কিছু অভিযানেই থেমে আছে উদ্যোগ। ফলে নগরবাসির ভোগান্তি বেড়েই চলেছে। বাড়ছে দুর্ঘটনা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের ৬ অক্টোবর থেকে ইজিবাইক প্রবেশ ও বের হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর শুরু হয়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই উদ্যোগ মুখ থুবড়ে পড়ে। গেল মাসে একই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও তা আর হয়নি। আর এ ক্ষেত্রে কেসিসি ও কেএমপির ট্রাফিক বিভাগ পরস্পরকে দায়ী করছেন। সম্প্রতি কেএমপি বৈধ লাইসেন্সধারী আট হাজার চালককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
সরেজমিনে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পয়েন্ট ঘুরে দেখা যায়, নগরীর প্রবেশদ্বার গল্লামরী, ময়লাপোতা মোড়, রুপসা, ডাকবাংলা, সোনাডাঙ্গা মোড়, খুলনা মেডিকেল, বয়রা মোড়,বিএল কলেজ মোড়, সকাল থেকে রাত অব্দি যানজট লেগে থাকে। বিশেষ করে গল্লামারী থেকে শহরে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে ছুটির দিনসহ প্রতিদিনই তীব্র যানজটের কবলে পড়তে হয়। কখনো কখনো খুলনা বিশ^বিদ্যালয় এরিয়ায় থাকা মৎস্য খামারের সামনে গল্লামারী ব্রীজ হয়ে লায়ন্স স্কুল পর্যন্ত দীর্ঘ গাড়ির লাইন থাকে। সন্ধায় ময়লাপোতা মোড়েও সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। কিন্তু রাস্তায় চালকদের তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছেনা। যত্রতত্র পার্কিং, জটলা পাকানো, রাস্তার মাঝখানে দাড়িয়ে যাত্রি ওঠানো নামানো হরহামেশাই চলছে।
নাগরিক নেতারা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে অপরিকল্পিতভাবে তিনচাকার ব্যাটারি চালিত ইজিবাইকের অনুমতি দেয়া হয়েছে। শহরের পরিধি, লোকসংখ্যা, চালকদের গাড়ি চালানোর যোগ্যতা, লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে বয়সের সীমার কথা বিবেচনায় না নেয়ার কারণে শহর ও নগরবাসিকে এই ভোগান্তি মেনে নিতে হচ্ছে। শৃঙ্খলা ফেরাতে দ্রুত ইজিবাইকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
কেসিসি সূত্র জানায়, ২০২০ সালে প্রথমবার যাত্রীবাহী ৭ হাজার ৮৯৭টি ইজিবাইককে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। ২০২২ আরও ১ হাজার ৭৯২টি পণ্যবাহী ইজিবাইক চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। অথচ নগরীতে ইজিবাইক চলাচল করে প্রায় ২০ হাজার। অতিরিক্ত ইজিবাইকের কারণে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে যানজট লেগেই থাকে। একাধিকবার ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিলেও কাজ হয়নি।
খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফুজ্জামান উজ্জল বলেন, বিশ^বিদ্যালয় থেকে শহরে কোন কাজ থাকলে লম্বা সময় নিয়ে বের হতে হয়। গল্লামারী পার হতেই আধা ঘন্টা সময় লেগে যায়। ময়লাপোতা মোড়েও একই অবস্থা। দ্রুত এর অবসান চাই।
কেসিসির সিনিয়র লাইসেন্স অফিসার মনিরুজ্জামান রহিম জানান, শুরুতে আমরা উচ্ছেদে যেতে পারিনি। কিন্তু কেসিসি থেকে লাইসেন্স দেয়া ইজিবাইক চালকদের রেডিও ফ্রি-কুয়েন্সি যুক্ত কার্ড সরবরাহ করা হয়েছে। যাতে বৈধ ও অবৈধ ইজিবাইক সনাক্ত করা যায়। তারপর আমরা অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে অভিযানের ধারাবাহিতা রক্ষা সম্ভব হচ্ছেনা। এ ছাড়া অবৈধ ইজিবাইক আগে শহর থেকে বের করতে না পারলে রুট ভাগ করে তা বস্তবায়ন সম্ভব হবেনা।
তিনি আরও বলেন, শৃঙ্খলা ফেরাতে আমাদের নানামুখি পরিকল্পনা রয়েছে।
শহরের বিভিন্ন প্রবেশ পথ দিয়ে বহিরাগত ইজবাইক প্রবেশ করে। আমরা চেষ্টা করছি সেসব স্পটগুলোকে সনাক্ত করতে এবং সেখানে নিয়ন্ত্রণ বুথ তৈরি করার। যাতে করে এসব ইজিবাইকের প্রবেশ ঠেকানো যায়। এ ছাড়া দুর্ঘটনা কমাতে চালকদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে কেএমপিকে কিছু অনুদান দিয়েছি। তারা কিছু প্রোগ্রাম করেছে এবং এটা আরও বড় পরিসরে করা হবে।
নিসচার খুলনা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান মুন্না বলেন, কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা ও ব্যর্থতাই মূলত এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। দায়িত্ব পালনে জনবল সংকটের কথা বলে দায় এড়ানো চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয়। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সড়কে শ্খৃলা ফেরাতে শিক্ষার্থী ও সামাজিক সংগঠনের সেচ্ছাসেবীরা কাজ করেছে। এখন যদি তারা জনবলের অভাবে কাজ করতে না পারে তাহলে আবার শিক্ষার্থী ও সেচ্ছাসেবি সংগঠনের সহায়তা নিক।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্তি-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক ও প্রটোকল) মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ বলেন, ইজিবাইকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও রুট নির্ধারণে গৃহিত পদক্ষেপ বাস্তবায়নে আমরা কেসিসির সহায়তা পাচ্ছি না। অবৈধ ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণে আমরা সপ্তাহে দুই অভিযান চালানোর কথা বলেছি, কিন্তু কেসিসি সেক্ষেত্রে সহায়তা করছে না। পুলিশ কাজ করতে প্রস্তুত। তারা লাইসেন্স দিয়েছে, প্রতি বছর ফি নেয়ার মাধ্যমে নবায়ন করছে। অথচ আমরা এখন পর্যন্ত আট হাজার ইজিবাইক চালককে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। শহরে যানজট নিরসনে নগরবাসিকে দায়িত্বশীল হতে হবে। শৃঙ্খলা মেনে চলাচল করতে হবে। অবৈধ ইজিবাইক ও রিকশা বন্ধের জন্য ইতিমধ্যে মাইকিং করা হয়েছে। যারা নিয়ম মানবে না তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



