এবার খুলনার আড়ংঘাটায় মধ্যযুগীয় কায়দায় পায়ে শিকল বেঁধে মাদ্রাসা ছাত্রকে নির্যাতন : শিক্ষক গ্রেপ্তার!

# ওই ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ভিকটিমের মায়ের মামলা দায়ের #
# পুলিশ বলছে : মামলা রুজুসহ অভিযুক্ত গ্রেপ্তার, তদন্তের কার্যক্রম চলমান #
স্টাফ রিপোর্টার : খুলনা মহানগরীর আড়ংঘাটা থানাধীন রংপুর ইউনিয়নের শলুয়া বাজারের পাশে আমিন নগর এলাকার হামিউস সুন্নাহ দারুল উলুম মাদ্রাসা ও লিল্লাহ এতিমখানায় রবিবার (৫ জুন) মাদ্রাসা শিক্ষক কর্তৃক মিরাজুল ইসলাম (১০) নামের এক শিশু শিক্ষার্থীকে মধ্যযুগীয় কায়দায় পায়ে শিকল বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠেছে। আরও অভিযোগ রয়েছে, ওই অভিযুক্ত শিক্ষকের গরু-বাছুর দেখভাল না করার কারনে ছাত্রকে মারধরের। শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের ঘটনায় ভিকটিমের মা রতœা খাতুন বাদী হয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশু আইনে মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-১)। পুলিশ ওই ঘটনায় অভিযুক্ত এজাহার নামীয় আসামীকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃত আসামী হলেন- হামিউস সুন্নাহ দারুল উলুম মাদ্রাসার মুহতামিম আড়ংঘাটা থানাধীন শলুয়া ঘোনারদারা এলাকার মৃত: দ্বীন মোহাম্মদ শেখের পুত্র আসলাম উদ্দিন (৫৭)। সোমবার (৬ জুন) দুপুরে আসামীকে আদালতে সোর্পদ করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করছেন আড়ংঘাটা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হালিমুর রহমান। পুলিশ বলছে, মাদ্রাসা শিক্ষক কর্তৃক শিশু ছাত্রকে নির্যাতনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় শিশু আইনে বাদী হয়ে মামলা করেন ভিকটিম শিশুটির মা। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষককে গ্রেপ্তার পূর্বক সোমবার (৬ জুন) দুপুরে আদালতে প্রেরণ করাসহ মামলার তদন্তের কার্যক্রমও চলমান রাখা রয়েছে। মাদ্রাসা পড়–য়া শিশু ছাত্রের উপর শিক্ষকের এমন মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের ঘটনায় গোটা ওই এলাকায় সর্বস্তরের শ্রেনী-পেশাজীবি মানুষের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন-‘ যে প্রতিষ্ঠানে শিশুরা নিরাপদে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহন করবে, সেখানে কিভাবে এমন নিষ্ঠুর ও অমানবিক ঘটনা ঘটতে পারে? দ্রুত সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত পূর্বক অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা। ভিকটিমের পরিবারের অভিযোগ, দিনমজুর বাবা ছেলেকে আলেম বাননোর উদ্দেশ্যে স্থানীয় হামিউস সুন্নাহ্ দারুল মাদ্রাসায় ভর্তি করার। মাদ্রাসার মুতামিম মাওলানা মো. আসলাম উদ্দিন (বড় হুজুর) শিশুটিকে দিয়ে সর্বক্ষণ ব্যক্তিগত কাজ (গরু-বাছুর দেখভাল) করতে বাধ্য করতেন, আপত্তি জানালে মারধর করতেন। যে কারনে প্রায় মিরাজুল পালিয়ে বাড়ীতে চলে আসতো। সর্বশেষ, তাকে মাদ্রাসায় আনতে গেলে পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান স্বজনেরা। বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শিশুদের প্রতি যেকোনো ধরনের সহিংসতা শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও গভীর প্রভাব ফেলে। ছোট্ট শিশু মিরাজুলের পা থেকে শিকল খুলে গেলেও সেই ভয় ও ট্রমা দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে। মামলার বাদী ও এজাহার সূত্রে জানা গেছে, আড়ংঘাটা থানাধীন খামারবাটি এলাকার জনৈক এক দাম্পতির পুত্র সন্তান মিরাজুল ইসলামকে গত, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে নূরানী শিক্ষা গ্রহনের জন্য আমিন নগর হামিউস সুন্নাহ দারুল উলুম মাদ্রাসা ও লিল্লাহ এতিমখানায় ভর্তি করানো হয়। সে সেখানে আবাসিক শাখায় লেখাপড়া করছে। মাঝে মধ্যে বাড়ীতে আসে। বাড়ীতে এসে প্রায় সে বলতো মাদ্রাসার বড় হুজুর আসামী আসলাম উদ্দিনের গরু দেখভাল করতে বলে এবং দেখভাল না করলে মারধর করে। বাদী জানায়, সর্বশেষ গত, ৩ জুলাই (শুক্রবার) আমার ছেলে মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে বাড়িতে এসে বলে গরু দেখাশুনা না করার কারণে বড় হুজুর আমাকে মারধর করেছে। তখন আমরা সিধান্ত নেয় ওই মাদ্রাসায় ছেলেকে আর পড়াশুনা করাব না। গত, ৫ জুন (রবিবার) সকাল ১১ টার দিকে আমার ছেলের ব্যবহারের জিনিসপত্র মাদ্রাসায় আনতে গেলে, অভিযুক্ত শিক্ষক ছেলেকে মাদ্রাসায় রেখে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন এবং তাকে দিয়ে অন্য কোনো কাজ করানো হবে না বলে আশ^াস করেন। তার আশ^াসের কারনে ছেলে পুনরায় মাদ্রাসায় রেখে আসা হয়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হুজুর আশ^াসের বিপরীতে ছেলের পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে মারধর করে এবং একটি মুগুরের (কাঠের) সাথে শিকল দিয়ে পা বেঁধে রাখে। অভিযুক্ত আমার ছেলেকে আঘাত উৎপীড়ন, অবহেলা এবং ব্যক্তিগত পরিচর্যার কাজে ব্যবহার করে তাকে শরিরীক ও মানষিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ করেছে বলেও জানান তিনি। ওই এলাকার বাসিন্দা মো. হান্নান মোড়ল জানান, মাদ্রাসার শিক্ষক কর্তৃক শিশু শিক্ষার্থীকে পায়ে শিকল বেঁধে নির্যাতন ও মারধরের ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখ জনক। শিশুদের প্রতি এমন ঘটনা মেনে নেওয়ার মতো নয়। যে প্রতিষ্ঠানে শিশুরা নিরাপদে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহন করবে, সেখানে কিভাবে এমন নিষ্ঠুর ও অমানবিক ঘটনা ঘটতে পারে? এটা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সুষ্ঠু তদন্ত পূর্বক অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তিনি। বাদী রতœা খাতুন জানান, মিরাজুল প্রায় মাদ্রাসা থেকে পালিয়ে আসতো। ঘটনার দিন মাদ্রাসায় তাকে আনতে গিয়ে পায়ে শিকল পড়ানো অবস্থায় দেখতে পায়। পরিবর্তীতে পুলিশ এসে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করে। আমি থানায় মামলা করেছি। আমি আমার ছোট্ট মাসুম বাচ্চার উপর যে অমানুষিক ও অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে তা সুষ্ঠু তদন্ত পূর্বক উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে দৌলতপুর থানা বিএনপির সাংগঠনিক ও আড়ংঘাটা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মতলুবুর রহমান মিতুল জানান, শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর। সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশু ছাত্রকে পায়ে শিকল বেঁধে নির্যাতনের ঘটনা সত্যিই দুঃখজনক ও পরিতাপের। প্রথমে শলুয়া ও ঘোনা এলাকার বাসিন্দারাসহ দলীয় নেতা কর্মীরা বিষয়টি আমাকে অবগত করেন, পরবর্তীতে বিএনপি অফিসে আসার পর দেখতে পায় ওই শিশুটির পায়ে শিকল দিয়ে বাঁধা। ওই ঘটনার বিস্তারিত পরবর্তীতে পুলিশ প্রশাসনকে জানালে তারা এসে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহন করেন। সর্বপরি, এমন ঘটনায় যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে এজন্য সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পুলিশ প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি। এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই সুর্বনা রানী পাল জানান, মাদ্রাসা শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রকে নির্যাতনের ঘটনায় ভিকটিমের মা বাদী হয়ে সংশ্লিস্ট থানায় মামলা করেছেন। ইতোমধ্যে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং মামলার তদন্তের কার্যক্রমও চলমান আছে। এ বিষয়ে আড়ংঘাটা থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হালিমুর রহমান জানান, ঘটনা শোনার পর ঘটনাস্থলে পৌছে নির্যাতনের শিকার শিশুটিকে উদ্ধারসহ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করি। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় ভিকটিম শিশুর মা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন, মামলার তদন্তের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
ক্যাপশন : আড়ংঘাটা থানা এলাকায় মাদ্রাসার শিশু ছাত্রকে নির্যাতনের ঘটনায় পুলিশ অভিযুক্ত শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে, ইনসেটে শিশুটিকে পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখার দৃশ্য….


