স্থানীয় সংবাদ

খুলনা ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চলছে ‘রোগী নির্যাতনের মহোৎসব’!

# স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি #
# পচা খাবার, তেলাপোকা-ছারপোকার দখলে হাসপাতাল #
# অনিয়ম-দুর্ণীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও নেই দৃশ্যমান ব্যবস্থা #

কামরুল হোসেন মনি ঃ খুলনার খুলনা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল এখন যেন চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, বরং অবহেলা, দুর্নীতি আর রোগী নির্যাতনের এক ভয়াবহ কারখানা।স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের জন্য রান্না করা নিম্নমানের তরকারি মুখে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দেওয়ার পরও বদলায়নি পরিস্থিতি। অভিযোগ উঠেছেÑমন্ত্রী চলে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই আবার শুরু হয়েছে আগের মতো পচা-দুর্গন্ধযুক্ত খাবার পরিবেশন, নোংরা পরিবেশ আর রোগীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ। গত শনিবার (২৩ মে) দুপুরে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, রোগীদের দেওয়া হচ্ছে মোটা চালের ভাত, পানিপানি মাছের ঝোল, নিম্নমানের কুমড়া-লাউয়ের তরকারি ও ডাল। অধিকাংশ রোগী সেই খাবার ফিরিয়ে দিচ্ছেন। অনেকে শুধু ভাত নিচ্ছেন, কেউ আবার পুরো খাবারই ডাস্টবিনে ফেলে বাইরে থেকে খাবার কিনে আনছেন। মডেল (পুরুষ) ওয়ার্ডে ভর্তি ৭০ বছর বয়সী আবুল হোসেন ক্ষোভে ফেটে পড়ে বলেন, “মন্ত্রী এসে খাবার মুখে দিয়ে ফেলে দিলেন, সুপারকে কঠোর নির্দেশ দিলেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। এখনও একই পচা মাছ, গন্ধযুক্ত তরকারি আর মোটা ভাত দেওয়া হচ্ছে। রোগীদের মানুষ হিসেবেও গণ্য করা হয় না।” তিনি আরও বলেন, “সকালের নাস্তা আসে ১০টার পরে। দুই পিস রুটি, একটা ডিম আর কলা দিয়ে দায়সারা খাবার। বেডে তেলাপোকা-ছাড়পোকা হাঁটে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ চাদর বদলায় না। রাতে নার্স ডাকলে বিরক্ত হয়, খারাপ ব্যবহার করে।”
একই ওয়ার্ডে থাকা রোগীর স্বজন মিনা বেগম বলেন, “ভাতে পচা গন্ধ। তরকারি মুখে দেওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনতে হয়। হাসপাতালে প্রায়ই মোবাইল চুরি হয়। গরিব রোগীরা অভিযোগ করতেও ভয় পায়Ñযদি চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়।”
লেবার ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন কমলা নামের এক নারী রোগী জানান, “২০ দিন ধরে হাসপাতালে আছি। একদিনও হাসপাতালের খাবার খাইনি। মাছের ঝোল সাদা পানি, দুর্গন্ধ করে। গদির ভেতরে আর বেডের নিচে অসংখ্য ছাড়পোকা।”
সরেজমিনে দেখা গেছে, লেবার ওয়ার্ডের একাধিক বেডে তেলাপোকা ও ছাড়পোকার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ওয়ার্ডজুড়ে অপরিষ্কার পরিবেশ, ময়লা বিছানা এবং অসহনীয় দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ রোগীরা। কেউ মেঝেতে বসে খাচ্ছেন, কেউ হাসপাতালের খাবার সরাসরি ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছেন।
গত বুধবার (২০ মে) আকস্মিকভাবে হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। রোগীদের জন্য রান্না করা নিম্নমানের তরকারি মুখে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দেন তিনি। হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. গাজী রফিকুল ইসলামকে উদ্দেশ করে তিনি প্রশ্ন করেন, “এ ধরনের তরকারি আপনাদের বাসায় রান্না হলে কি খেতেন?”
একই সফরে রোগীরা অভিযোগ করেন, হাসপাতালের র‌্যাবিস ভ্যাকসিন না পেয়ে বাইরে থেকে টাকা দিয়ে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। পরে ঢাকায় যোগাযোগ করে মন্ত্রী জানতে পারেন, ভ্যাকসিনের কোনো চাহিদাপত্রই পাঠানো হয়নি। এতে তিনি চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতালের অনিয়মে ক্ষুব্ধ হয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে থাকা এক এপিএস হাসপাতালের সুপার ডা. গাজী রফিকুল ইসলামকে ওএসডি করার বিষয়েও নোট নেন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তা জানানোর নির্দেশ দেন।
এদিকে হাসপাতালের প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক (বড় বাবু) মো. তরিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন হলেও এখন পর্যন্ত প্রকাশ হয়নি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করেই বছরের পর বছর বহাল তবিয়তে রয়েছেন তিনি।
হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এ হাসপাতালে অনিয়ম এখন ওপেন সিক্রেট। রোগীদের খাবার, ওষুধ, ভ্যাকসিন, ঠিকাদারিÑসবখানেই সিন্ডিকেট সক্রিয়।”
অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. গাজী রফিকুল ইসলাম বলেন,
“বরাদ্দ টাকার মধ্যে কীভাবে খাবারের মান উন্নত করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। ঠিকাদারকে ডাকা হয়েছিল, তিনি আসেননি। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।” তবে রোগীদের বেডে তেলাপোকা-ছাড়পোকা, নোংরা পরিবেশ এবং নিম্নমানের খাবারের বিষয়ে তিনি সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
ওএসডি প্রসঙ্গে ডা. গাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, “মন্ত্রী যখন র‌্যাবিস ভ্যাকসিন নিয়ে কথা বলছিলেন, তখন তিনি ফোনে সরাসরি এজি অ্যাডমিনকে বলছিলেন আমাকে ওএসডি করে দ্রুত আদেশ পাঠাতে। সেই কথাই মিডিয়ায় এসেছে।”
রোগীদের প্রশ্নÑস্বাস্থ্যমন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারির পরও যদি একটি সরকারি হাসপাতালে একইভাবে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা আর রোগী নির্যাতন চলতে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button