খুলনাবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজে বিভিন্ন জটিলতা কাটবে কবে? আটকে আছে পরিবর্তিত ডিজাইনের মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও রেলওয়ের জায়গা হস্তান্তর

সৈয়দ জাহিদুজ্জামান দিঘলিয়া খুলনা থেকেঃ নকশায় ত্রুটি, জমি অধিগ্রহণসহ নানা সংকটে নির্ধারিত মেয়াদে শেষ হয়নি খুলনার ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজ। এখানেই শেষ নয়, কাজ শুরুর সাড়ে তিন বছরে অগ্রগতি মাত্র ১৫ শতাংশ। ফলে এই সেতুটি কবে বাস্তবায়িত হবে আর মহানগরী খুলনার সঙ্গে দিঘলিয়া উপজেলা ও নড়াইল, গোপালগঞ্জসহ দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের সরাসরি সংযোগ হবে, তা বলতে পারছে না কেউ। এ অঞ্চলের মানুষের স্বপ্নের ভৈরব সেতু কি স্বপ্ন হয়েই থাকবে এ আশঙ্কায় অপেক্ষার প্রহর গুনছে। স্থানীয় লোকজন দল-মত না দেখে দ্রুত সেতুটি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, সেতুটি বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের অবহেলিত কৃষিনির্ভর দিঘলিয়াসহ ভৈরবপারের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি গড়ে উঠবে বাণিজ্যিক জোন। সেতু প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, মহানগরী খুলনার সঙ্গে দিঘলিয়া, কালিয়া, নড়াইল, গোপালগঞ্জসহ আশপাশের এলাকার সংযোগ স্থাপনে ভৈরব নদের ওপর একটি সেতু নির্মাণের যৌক্তিক দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। ভৈরব সেতু বাস্তবায়ন সংস্থা মেসার্স ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের প্রকৌশলী সূত্রে জানা গেছে, উক্ত সেতুটি পরিবর্তিত নকশায় ২৯ টি পিলারের উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। ইতো মধ্যে দিঘলিয়া অংশের পিলারগুলোর কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। নতুনভাবে আবার কাজ শুরু হয়ে খুবই ধীর গতিতে খুলনা শহরাংশে পিলার ঢালাই কাজ চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৩ দফায় সময় পরিবর্তন করেও কাজ শেষ করা যায়নি যুক্তিযুক্ত কারণে।
খুলনার ভৈরব সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজ জমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও নকশা পরিবর্তনের কারণে বেশ ধীরগতিতে চলছে। দিঘলিয়া প্রান্তে কয়েকটি পিলার দৃশ্যমান হলেও শহরাংশ অর্থাৎ রেলিগেট প্রান্তে কাজ থমকে আছে। বর্তমানে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে এবং সওজ (জঐউ) ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। খুলনার ভৈরব সেতুর নকশায় মূলত ভবিষ্যৎ যানবাহনের চাপ সামলানো, দুর্ঘটনা রোধ এবং নদী সুরক্ষার জন্য বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। খুলনার ভৈরব সেতুর সংশোধিত ও নতুন নকশায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। মূল সেতুটি কংক্রিটের পরিবর্তে এখন ঢাকার হাতিরঝিল বা কালনা সেতুর মতো আর্চ টাইপ স্টিল স্প্যান দিয়ে তৈরি করা হবে। নদীর গভীরতা ও নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে মূল স্প্যানের দৈর্ঘ্য ১০০ মিটার থেকে বাড়িয়ে ১৬০ মিটার করা হয়েছে। ফলে নদীর মাঝখানে কোনো পিলার থাকবে না। সেতুর প্রশস্ততা ৭.৩ মিটার থেকে বাড়িয়ে ১০.৩ মিটার করা হচ্ছে। নতুন নকশায় সাধারণ যানবাহনের পাশাপাশি ভ্যান, রিকশা ও ইজিবাইক চলাচলের জন্য পৃথক স্বল্পগতির লেন (সার্ভিস লেন) যুক্ত করা হয়েছে। ব্রিজের বাঁক ঠিক রাখতে ২৮টি পিলারের মধ্যে বেশ কয়েকটিতে আরসিসি ডিজাইনের বদলে স্টিল গার্ডার ব্যবহার করা হবে। বর্তমানে সেতুর কাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ৩০ জুন। দৌলতপুর-দিঘলিয়ার মাঝে ভৈরব নদের উপর নির্মাণাধীন ভৈরব সেতুর জন্য জমি অধিগ্রহণ ও বিদ্যুৎ পোল স্থানান্তর সম্পন্ন হলেও খুলনা শহরাংশের রেলওয়ের জায়গা হস্তান্তর প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। অপরদিকে এ ভৈরব সেতুর নির্মাণ কাজের ধীর গতি শুরু থেকে পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। কাজে কেন ধীর গতি এ প্রশ্নের জবাব আজও অবধি মিলেনি। উল্লেখ্য, গণমুখি এ সেতুটির নির্মাণ কাজ সম্পন্নের দাবী পূরণে ২০১৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর ভৈরব সেতু নামের প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন লাভ করে। স্টিল স্ট্রাকচারের ১.৩১৬ কিলোমিটার সেতুটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৬১৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে মূল সেতু নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৩০৩ কোটি টাকা, জমি অধিগ্রহণে ২৮১ কোটি টাকা ও বাকি বরাদ্দ সেতু সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজে। ২০২০ সালের ২৭ জুলাই সেতু নির্মাণ কাজের দরপত্র আহবান করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে কাজটি বাস্তবায়ন করছে ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন লিমিটেড (করিম গ্রুপ) নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ না করেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটিকে ওয়ার্ক অর্ডার দেয়। ২০২১ সালের ২৪ মে দিঘলিয়া প্রান্তে সরকারি খাস জমির ওপর ২৪ ও ২৫ নম্বর টেস্ট পাইলিংয়ের নির্মাণ কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম মেয়াদের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ কাজ করতে পারেনি। বর্তমানেও সেতুর শহরাংশের রেলওয়ের জমির হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। কয়েকটা পিলারের ঢালাই কাজ চলছে ঢিলেঢালাভাবে। খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ তানিমুল হক এ প্রতিবেদককে জানান, শহরাংশে ধীর গতিতে কিছু পিলারের ঢালাই কাজ চলছে। সেতুর পরিবর্তিত ডিজাইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ডিজাইন পরিপূর্ণ অনুমোদিত হলেই জোরে শোরে কাজ শুরু করা হবে।



