কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে ঢাবিতে বিক্ষোভে নাহিদের তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা

রক্তাক্ত জুলাই / জুলাই আন্দোলনের সেই দিনগুলি (পর্ব-১) ঃ
এম সাইফুল ইসলাম ঃ চব্বিশের পহেলা জুলাই, সোমবার। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নতুন করে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীরা বৈষম্যমুক্ত, মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থার দাবিতে বিক্ষোভ, মিছিল ও ছাত্রসমাবেশ করেন এবং টানা তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা দেন। সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। সেখান থেকে একটি মিছিল কলাভবন, শ্যাডো, মল চত্বর, মাস্টারদা সূর্য সেন হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও বসুনিয়া তোরণ প্রদক্ষিণ করে রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশে আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন, ৪ জুলাই পর্যন্ত দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করা হবে। তিনি বলেন, ৪ জুলাইয়ের মধ্যে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আন্দোলনের দাবির সুরাহা করতে হবে এবং কোটা বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে হবে। একই সঙ্গে আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল, গ্রন্থাগার ও চিকিৎসাসেবাসহ সব সুযোগ-সুবিধা চালু রাখার আহ্বান জানান তিনি। সমাবেশ থেকে তিন দিনের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। কর্মসূচি অনুযায়ী, পরদিন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার থেকে গণপদযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি ৩ ও ৪ জুলাই রাজধানীর বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রাজু ভাস্কর্যে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। সমাবেশে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থী সারজিস আলম বলেন, “বীর মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাঁদের মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা অক্ষুণœ থাকুক। তবে সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা ব্যবস্থার পরিবর্তে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।” আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে ছিলÑ২০১৮ সালের কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহাল, ভবিষ্যতে কোটা বিষয়ে কমিশন গঠন করে যৌক্তিক সংস্কার, সংবিধান অনুযায়ী অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা, একই ব্যক্তি যেন একাধিকবার কোটার সুবিধা নিতে না পারেন, কোটায় যোগ্য প্রার্থী না থাকলে শূন্য পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ এবং দুর্নীতিমুক্ত ও নিরপেক্ষ নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এই আন্দোলনের পেছনে ছিল উচ্চ আদালতের একটি রায়। ঈদুল আজহার আগে ৫ জুন উচ্চ আদালত সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের ২০১৮ সালের পরিপত্রের সংশ্লিষ্ট অংশকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এর পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন শুরু হয়। পরে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে আপিল বিভাগ ৪ জুলাই শুনানির দিন নির্ধারণ করেন। ঈদের ছুটির কারণে আন্দোলন সাময়িক স্থগিত থাকলেও সরকারকে দেওয়া ৩০ জুনের আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার পর আবারও শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামেন। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের আগে সরকারি চাকরিতে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা প্রচলিত ছিল। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিল ৩০ শতাংশ। ওই বছর দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর সরকার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে। পরবর্তীতে ওই পরিপত্রের বৈধতা নিয়ে আদালতে আইনি লড়াই শুরু হলে ২০২৪ সালে বিষয়টি আবার জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে আসে। এই দিনের কর্মসূচি পরবর্তী সময়ে যে গণআন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করেছিল, তা-ই ক্রমান্বয়ে জুলাই আন্দোলনের বিস্তৃত রূপ নেয়। কোটা ইস্যু থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন পরবর্তীতে বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, ন্যায়বিচার এবং বৈষম্যবিরোধী দাবির প্রতীকে পরিণত হয়। বিএল কলেজের শিক্ষার্থী এবং পরবর্তীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সহ-সমন্বয়ক সাজিদুল ইসলাম বাপ্পি বলেন, “পহেলা জুলাই নয়, তারও আগে থেকেই আমরা সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। আমরা ৬ জুন খুলনা প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ করি। প্রতিকূল পরিবেশের কারণে উপস্থিতির সংখ্যাও খুব অল্প ছিল।”



