স্থানীয় সংবাদ

পাইকগাছায় উন্নয়ন কাজের নামে হরিলুট!

৪ ইঞ্চির ঢালাই মিলছে সর্বোচ্চ ৩ ইঞ্চি, স্লাবে মেলেনি রড, লবণ বালি দিয়ে ঢালাই সম্পন্ন : ইউএনও’র আকস্মিক পরিদর্শনে সত্যতা মেলায় কাজ ভেঙ্গে নতুন করে করার নির্দেশ

পাইকগাছা (খুলনা) প্রতিনিধি:
খুলনার পাইকগাছা পৌরসভায় সরকারের উন্নয়ন বরাদ্দের অর্থ লোপাটের এক নজিরবিহীন ও নিকৃষ্ট চিত্র সামনে এসেছে। পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিসি ঢালাই রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ কাজে প্রাক্কলন (সিডিউল) সম্পূর্ণ অমান্য করে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সিডিউলের তোয়াক্কা না করে ঠিকাদারের এমন প্রকাশ্য হরিলুটে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের শিববাটির টোল আনারের বাড়ি থেকে পৌর কর্মচারী কার্য্য সহকারী বিদ্যুৎ কুমার রায়ের বাড়ি পর্যন্ত আনুমানিক ১০৮ মিটার সিসি সড়ক ও ড্রেন নির্মাণকাজে ব্যাপক জালিয়াতি করা হয়েছে। কাজটির মূল বরাদ্দ পায় ‘আখি এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে সাব-ঠিকাদার হিসেবে ইউসুফ আলী সরদার নামের এক ব্যক্তি কাজটি সম্পন্ন করেন। গত ২৮ জুন’২৬ রাস্তাটির ঢালাই কাজ সম্পন্ন হয়।
অভিযোগ উঠেছে, সিডিউল অনুযায়ী সিসি রাস্তায় ৪ ইঞ্চি পুরুত্ব (থিকনেস) ঢালাই দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে দেওয়া হয়েছে মাত্র আড়াই থেকে সর্বোচ্চ ৩ ইঞ্চি। এমনকি কোনো কোনো অংশে মাত্র ২ ইঞ্চি ঢালাই দিয়েই কাজ শেষ করার মতো ধৃষ্টতা দেখানো হয়েছে।
শুধু রাস্তার পুরুত্ব চুরিই নয়, ড্রেনের স্লাবের ঢাকনা ভেতরে বাধ্যতামূলকভাবে রডের খাঁচা দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, তা পুরোপুরি লঙ্ঘন করে ‘রড ছাড়াই’ স্রেফ লবণ বালু ও সিমেন্টের প্রলেপে দেদারসে স্লাব ঢালাই করা হয়েছে। জালিয়াতি ঢাকতে লুকিয়ে রাখা ১০টি অব্যবহৃত রডের খাঁচাও স্থানীয় জনতা হাতেনাতে উদ্ধার করে। এছাড়া নির্মাণকাজে লবণাক্ত বালু এবং অত্যন্ত নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে। সিমেন্টের পরিমাণ এতটাই কম ছিল যে, ঢালাইয়ের মাত্র দুই দিন পরেই হাত দিয়ে তা ভেঙে ফেলা যাচ্ছে।
এই হরিলুটের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেন। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পৌর নির্বাহী প্রকৌশলী নুর আহাম্মদ বলেন, আমি সাতক্ষীরা পৌরসভায় কর্মরত। পাইকগাছা পৌরসভায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি। এ বিষয়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী ও কার্যসহকারী বিস্তারিত বলতে পারবেন।
উপসহকারী প্রকৌশলী লিংকন বলেন, যদি সিডিউল অনুযায়ী কাজ না হয়ে থাকে, তাহলে প্রয়োজন হলে ত্রুটিপূর্ণ অংশ ভেঙে পুনরায় সিডিউল অনুযায়ী নির্মাণ করা হবে।”
অন্যদিকে, কার্যসহকারী বিদ্যুৎ কুমার রায় নিজের দায় এড়াতে বলেন, “ঠিকাদার আমার নির্দেশনা না মেনে জোর করে কাজ করেছেন।” সরকারি অর্থের এই প্রকাশ্য জালিয়াতি দেখে এলাকার লোকজন ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন। বিষয়টি পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরীর নজরে আসলে তিনি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেন। ১ জুলাই’২৬ বিকাল ৪টায় অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পৌর নির্বাহী প্রকৌশলী নুর আহাম্মদকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। পরিদর্শনকালে উল্লেখিত সব অভিযোগের সত্যতা হাতেনাতে প্রমাণ পান ইউএনও। ঘটনাস্থলেই ক্ষুব্ধ ইউএনও ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং নির্বাহী প্রকৌশলীকে অনতিবিলম্বে পুরো ত্রুটিপূর্ণ ঢালাই ও ড্রেন ভেঙ্গে সিডিউল মোতাবেক সম্পূর্ণ নতুন করে কাজ সম্পন্ন করার জন্য কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button