আজমুল হত্যার বিচার দাবিতে নগরীতে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ

# ভাত লাগলে ভাত নে, আমার ভাইরে ফেরত দে’ #
স্টাফ রিপোর্টার ঃ সামান্য খাবার নিয়ে অভিযোগ তুলে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আজমুল হোসেনকে পিটিয়ে ও ভবনের ছাদ থেকে ফেলে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে খুলনায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে মহানগরীর এম এ বারী সড়কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করেন নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘একজন ছাত্রকে সামান্য খাবার নিয়ে অভিযোগ তুলে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এক প্লেট ভাতের মূল্য আর একটি জীবনের মূল্য এক হতে পারে না। এটি শুধু একটি হত্যাকা- নয়, আমাদের ক্যাম্পাস ও মেসজীবনে বিরাজমান নিরাপত্তাহীনতা ও নৈরাজ্যের ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।’ তারা বলেন, পড়াশোনার জন্য পরিবার ছেড়ে আসা একজন তরুণ শিক্ষার্থীকে এভাবে প্রাণ দিতে হয়েছে। এর দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কারও নেই। ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া শিক্ষকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘটনার প্রায় ৬০ ঘণ্টা পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। তুচ্ছ একটি অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারবহির্ভূতভাবে একজন শিক্ষার্থীকে হত্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দ্রুত প্রকৃত হত্যাকারীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তারা আরও বলেন, ‘নাজমুল শুধু আমাদের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র নয়, সে বাংলাদেশের একজন ছাত্র। তার হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে হবে।’ নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল বলেন, ‘ঘটনা অনেকটা খোলাসা হয়ে গেছে। তাকে ভাত চুরির অভিযোগে, মিথ্যা ও তুচ্ছ অভিযোগে বেধড়ক প্রহার করা হয়। এরপর তাকে ছাদে নিয়ে গিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছেÑএটাই বাস্তবতা।’ তিনি বলেন, ‘এখানে যারা সংশ্লিষ্ট, এটি একজনের কাজ নয়। বহু শিক্ষার্থীর সমন্বয়ে একটি দলগতভাবে তাকে মারা হয়েছে। আমরা তার কিছু চুল পড়ে থাকতে দেখেছি। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্নও দেখেছি। খোলা চোখে যা দেখেছি, তাতে তাকে বেধড়ক প্রহার করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে।’ উপাচার্য আরও বলেন, ‘আমরা এই অমানবিক নির্যাতন ও ছাত্র হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের গ্রেপ্তার করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তাদের বিচার কার্যকর করার জোর দাবি জানাচ্ছি। দুঃখের বিষয়, প্রায় ৬০ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও এখনো কোনো আসামি গ্রেপ্তার হয়নি।’ তিনি জানান, মেস ব্যবস্থাপকের বক্তব্য থেকেও ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার সঙ্গে একাধিক শিক্ষার্থীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ও উঠে এসেছে।
পরে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বিক্ষোভ সমাবেশে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি আধা ঘণ্টার মধ্যে আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীকে বিষয়টি জানাবো। তিনি যেন এ বিষয়ে নজর রাখেন। অপ্রতিমের বিষয়ের মতো যেন এ বিষয়টিও দেখেন।’ আন্দোলনরত শিক্ষার্থী শেখ তাশিক আহমেদ বলেন, প্রশাসন তাদের দাবি অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ৩০ দিনের মধ্যে চার্জশিট জমা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এ কারণে দুপুর দেড়টার দিকে তারা বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষ করেন। মানববন্ধন শেষে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় তারা ‘ভাত লাগলে ভাত নে, আমার ভাইরে ফেরত দে’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনী কেন বাহিরে’ এবং ‘তুমি কে, আমি আজমুল, আজমুল’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন।
উল্লেখ্য, ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খানজাহান আলী হলের বিপরীতে মসজিদ গলির একটি ভবনে আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, রাতে মেসে মিল না দিয়ে ভাত খাওয়ার ঘটনায় তাকে মারধর করা হয়। একই সঙ্গে তার চুল কেটে দেওয়া হয়। এ সময় আজমুলের বাবার কাছে ফোন করে এক লাখ টাকা চাঁদা চাওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। মারধরের পর তাকে ভবনের চতুর্থ তলা থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছেÑএমন অভিযোগও উঠেছে। এ ঘটনায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীসহ অজ্ঞাত আরও ২০ থেকে ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় নাম থাকা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন এফএমআরটি ডিসিপ্লিনের ১৭ ও ১৯ ব্যাচের রবিন ও মবিন, গণিত ডিসিপ্লিনের ১৯ ব্যাচের সাগর এবং এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের ২৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী ওবায়দুল। আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে তারা এসব দাবি জানান। সমাবেশে বক্তারা বলেন, ঘটনার সঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী জড়িত থাকলে তার পরিচয়, পদমর্যাদা বা ব্যাচ বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।



