োজীবনের ঝুঁকি ও ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে দুবলার চরের পথে উপকূলীয় জেলেরা

এম. মোসলেম উদ্দিন আহমেদ, পাইকগাছা (খুলনা) : তীব্র অর্থনৈতিক সংকট, দাদন ব্যবসায়ীদের চড়া সুদের ঋণের বোঝা এবং জীবনের চরম ঝুঁকি মাথায় নিয়ে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার জেলে বঙ্গোপসাগরের গভীর জলরাশি ও ঐতিহ্যবাহী দুবলার চরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছেন। শীতকালীন শুঁটকি মৌসুমকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের জেলে পল্লীগুলোতে এখন চরম ব্যস্ততা ও কর্মচাঞ্চল্য বিরাজ করছে। উপজেলার বোয়ালীয়া, মাহমুদকাঠি, হিতামপুর, কাটাখালী, হাবিবনগর, নোয়াকাঠি, রামনাথপুর ও কাঠিপাড়া গ্রামের প্রায় তিন শতাধিক পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণের সঙ্গে জড়িত। তবে সাগরে যাওয়ার পথটি কখনোই সহজ নয়। নদীমাতৃক এই অঞ্চলের নদ-নদীতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং জীবিকার অন্য কোনো বিকল্প না থাকায় জেলেরা সুন্দরবন ও সমুদ্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। কিন্তু তফসিলি ব্যাংকগুলো থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার কথা থাকলেও নানা জটিল শর্তের বেড়াজালে তা না পেয়ে জেলেরা বাধ্য হয়ে স্থানীয় মহাজন ও দাদনদারদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নেন। নৌকা মেরামত, নতুন জাল কেনা এবং খাদ্য ও জ্বালানি সংগ্রহের জন্য এই দাদনের টাকা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় থাকে না। মৌসুম শেষে কাঙ্ক্ষিত মাছ বিক্রি করে এই ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে তাদের জীবন চরম বিপাকে পড়ে। মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, শীত মৌসুমে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার জন্য পাইকগাছা উপজেলার বিভিন্ন জেলে পল্লীর ১৯৫০ জন জেলে সরকারিভাবে তালিকাভুক্ত রয়েছেন এবং তারা খাদ্য সহায়তা পান। শিবসা ও পশুর নদী হয়ে জেলেরা প্রথমে মোংলায় সমবেত হন। এরপর নিষেধাজ্ঞা শেষ হলে পাস-পারমিট নিয়ে সুন্দরবনের দুবলার চর, আলোর কোলসহ বঙ্গোপসাগরের গভীর অংশে অস্থায়ী জেলে পল্লী তৈরি করে মাছ ও শুঁটকি আহরণে নিয়োজিত হন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেলেদের জীবনে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। সাগরে আধুনিক জিপিএস ট্র্যাকিং বা উন্নত রেডিও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব থাকায় হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা নি¤œচাপের সময় তারা সময়মতো নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরতে পারেন না। এর ওপর জলদস্যুদের আতঙ্ক, ভারতীয় বা বিদেশি বড় ট্রলারের আগ্রাসন এবং কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ার অনিশ্চয়তা তাদের জীবনকে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। বোয়ালিয়া জেলে পল্লীর বাসিন্দা অশোক বিশ্বাস আক্ষেপ করে জানান, প্রতি বছর মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সাগরে যাই। অথচ সরকারিভাবে আমরা পর্যাপ্ত কোনো সহযোগিতা পাই না। একই গ্রামের সিতেনাথ বিশ্বাস বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা গভীর সমুদ্র থেকে মাছ শিকার করে কোটি টাকার রাজস্ব দিই সরকারকে, অথচ সাগরে নামার জন্য আমরা কোনো সহজ ঋণ বা সরকারি সহায়তা পাই না। পরিবার ও পেটের টানে বুকভাঙ্গা কষ্ট আর অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে জেলেরা জাল, নৌকা ও ট্রলার প্রস্তুত করে সাগরে পাড়ি জমাচ্ছেন। উপকূলীয় এসব জেলের জীবনমানের স্থায়ী উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং সহজ শর্তে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণের ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।



