জাতীয় সংবাদ

মহামারি রূপে হাম : বহুমুখী পদক্ষেপ না নিলে ঘটবে বিপর্যয়

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ বাংলাদেশে বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব মহামারি আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে সংক্রমণের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং চলমান এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৬টিতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ও যথাযথ বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এটি বড় ধরনের স্বাস্থ্য বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা এক হাজার ৩৭১ জন। ১৫ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২৪ জনে। একই সময়ে গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৮২ জন এবং ১৫ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা দুই হাজার ৭২১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হাম রোগে আরও দুই জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে ১৫৬ জনের। অর্থাৎ, ১৫ মার্চ থেকে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে নিশ্চিত ও সন্দেহজনক মিলিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার এবং একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১৮৬ জনের। যদিও স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বিগত বছরগুলোর চিত্র ঃ এশিয়া অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে হাম ও রুবেলা ভাইরাস নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০২২ সালে প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় হামের সংক্রমণের হার ছিল ১ দশমিক ৪১, ২০২৩ সালে ১ দশমিক ৬০, ২০২৪ সালে ১ দশমিক ৪৩ এবং ২০২৫ সালে শূন্য দশমিক ৭২। কিন্তু বর্তমানে এই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশে। লক্ষ্যমাত্রার বছরেই এমন ভয়াবহ সংক্রমণ জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। টিকাদানের পরিসংখ্যান ঃ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে এমআর-১ টিকার কভারেজ ছিল ৮৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এমআর-২ ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা ছিল যথাক্রমে ৮৬ দশমিক ৪ ও ৮৪ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৯ সালে ৮৮ দশমিক ১ ও ৮৬ দশমিক ১ শতাংশ, ২০২০ সালে ৮১ দশমিক ৭ ও ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২১ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯৭ দশমিক ৩ ও ৯৪ দশমিক ৮ শতাংশে। ২০২২ সালে এমআর-১ শতভাগ এবং এমআর-২ ছিল ৯৭ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৩ ও ২০২৪ সালেও কভারেজ ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের মধ্যে ছিল। তবে ২০২৫ সালে টিকাদানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ওই বছর এমআর-১ টিকার কভারেজ নেমে আসে ৫৬ দশমিক ৫ শতাংশে এবং এমআর-২ দাঁড়ায় ৫৭ দশমিক ১ শতাংশে। ফলে প্রায় ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন কভারেজ। বাংলাদেশে প্রতি চার বছর অন্তর হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হয়। তবে ২০২০ সালের করোনা মহামারি, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ এবং চলতি বছরের শুরুতে নতুন সরকারের নির্বাচন; এসব কারণে টিকাদান কার্যক্রম সময়মতো সম্পন্ন হয়নি। সংক্রমণ বৃদ্ধির কারণ ঃ বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানে ব্যত্যয়ই হামের প্রকোপ বৃদ্ধির প্রধান কারণ। আগে যেখানে ৯৭-৯৮ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় ছিল, সেখানে গত প্রায় ১৮ মাস ধরে এই হার ৬০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। ফলে হার্ড ইমিউনিটি ভেঙে পড়ে এবং সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এক বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন। বছরে দুবার হওয়ার কথা থাকলেও গত দুই বছরে এটি মাত্র দুবার হয়েছে। ভিটামিন ‘এ’ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এছাড়া অপুষ্টিও বড় একটি কারণ। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা সহজেই সংক্রমিত হয়। বর্তমানে আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু অপুষ্টির শিকার বলে জানা গেছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, করোনার সময় মাঠপর্যায়ে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়। অনেক শিশু সময়মতো টিকা পায়নি। পরবর্তীতে গণটিকাদান কার্যক্রমও বন্ধ থাকায় টিকাবঞ্চিত শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে, যা চলতি বছরে হামের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। শিশুরা টিকা না পাওয়ায় এটি মহামারি আকার ধারণ করেছে। যেকোনো সংক্রমণ যখন অতিরিক্ত হয়ে যায়, ভাইরাস মারাত্মক শক্তি ধারণ করে। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ডা. আবু জামিল ফয়সাল বাংলানিউজকে বলেন, প্রাথমিক পর্যায়েই আউটব্রেক ইনভেস্টিগেশন করা হলে প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা যেত। টিকা সংগ্রহ, সরবরাহ ও জনবল সংকটসহ একাধিক কারণ একত্রে কাজ করেছে বলে তিনি মনে করেন। মহামারি কি না? ঃ বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো রোগের স্বাভাবিক সংক্রমণ হঠাৎ করে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে তাকে মহামারি বলা হয়। যেমন, কোনো একটি অঞ্চলে সাধারণত প্রতি বছর কোনো রোগে যতজন মানুষ আক্রান্ত হয়, হঠাৎ করে যদি একই সময়ে সেই সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়, তখন সেটাকে মহামারি বলা হয়। যেমন ঢাকা বিভাগে বা বাংলাদেশে যদি প্রতি বছর ১০০ জন হাম রোগী থাকে, আর কোনো বছরে হঠাৎ তা বেড়ে ৫০০ জনে পৌঁছে যায়, তাহলে সেটিকে মহামারি বলা হয়। ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলছেন, মানুষ ভয় পাবে বলে এখন মহামারি শব্দটা ব্যাবহার করা হচ্ছে না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, গত ১৫-২০ বছরে বাংলাদেশে এত সংখ্যক মানুষ হামে আক্রান্ত হয়নি এবং মৃত্যুও এত হয়নি। চলতি বছর হামের প্রকোপ অনেক বেড়েছে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী এটি মহামারি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। দেশে হামের মহামারি শুরু হয়ে গেছে। প্রতিরোধে করণীয় ঃ বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সময়ের মধ্যে সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা এখন সবচেয়ে জরুরি। আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, হাম হলে বাচ্চারা খুব দুর্বল হয়ে যায়। তাদের মধ্য থেকেই অনেকের মৃত্যু হয়। ফলে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও শিশুকে একটা নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। করোনাভাইরাসের সময় আমরা যেখানে একটা টাইমলাইন মেনে চলতাম, ঠিক সেভাবেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোনো শিশুর মৃত্যু যেন না হয় তা নিশ্চিত করা। এজন্য চিকিৎসার মান উন্নয়ন জরুরি। অর্থাৎ হামের চিকিৎসায় জোর দিতে হবে। আমাদের চিকিৎসায় ঘাটতি রয়েছে। এখন যে পরিমাণ রোগী ভর্তি হচ্ছে, তাতে আগামী চার থেকে আট সপ্তাহ এই পরিস্থিতি চলমান থাকা অস্বাভাবিক নয়। চিকিৎসা যদি উন্নত না হয়, তাহলে প্রতিদিন এভাবে আমাদের শিশুদের মৃত্যু মেনে নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের চিকিৎসকেরা যেন একই মানের চিকিৎসা দিতে পারেন, সে জন্য হামের চিকিৎসায় একটি জাতীয় গাইডলাইন তৈরি করতে হবে। প্রতিদিন শিশুরা কেন হামে মারা যাচ্ছে, তা বোঝাতে গেলে চিকিৎসায় কোথাও না কোথাও ঘাটতি রয়েছে। গাইডলাইন তৈরি করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের জানিয়ে দিতে হবে। এটি অনেক আগেই করা উচিত ছিল। এমনকি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের চিকিৎসকদেরও এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। চিকিৎসার মান যদি ২৫ শতাংশও উন্নত করা যায়, তাহলে মৃত্যুও ২৫ শতাংশ কমানো সম্ভব। এই জনস্বাস্থ্যবিদ আরও বলেন, গাইডলাইনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধসহ চিকিৎসার সব উপকরণ সব হাসপাতালে সরবরাহ করতে হবে। টিকাদান কার্যক্রম চলছে, সেটি ভালো উদ্যোগ। তবে সেই টিকাদানেও কিছু ঘাটতি রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত এসব পদক্ষেপ নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে। করোনার সময় প্রতিদিন ব্রিফিং করা হতো, এখন হামের ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে না, অথচ এটিও একটি মহামারি পরিস্থিতি। এই অবস্থায় নিয়মিত ব্রিফিং হওয়া উচিত। সরকার কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা জানার অধিকার জনগণের রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button