জাতীয় সংবাদ

তেলের লাইন বাড়াচ্ছে যানজট : জনভোগান্তি চরমে

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ রাজধানীর ঢাকায় যানজট এখন নিত্যদিনের বাস্তবতা। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত শহরের প্রধান সড়কগুলোয় ধীরগতি আর দীর্ঘ অপেক্ষা স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট নিরসনে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা খুব একটা দৃশ্যমান নয়। বরং বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, অনিয়ন্ত্রিত সড়ক ব্যবহার এবং দায়িত্বহীন আচরণের কারণেই এসব উদ্যোগ বারবার থমকে যাচ্ছে। ঢাকার সড়কে গণপরিবহনের শৃঙ্খলাহীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বাসচালকরা নিয়ম উপেক্ষা করে যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছেন, সিএনজি ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচলে লেন মানছে না। একই সঙ্গে যাত্রীরাও নির্ধারিত স্টপেজ ব্যবহারে অভ্যস্ত নন; রাস্তার যেকোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে বাস থামানো এখন সাধারণ দৃশ্য। এসব মিলিয়ে শহরের যানজট যেন এক অনিয়ন্ত্রিত চক্রে আটকে আছে। এরই মধ্যে পরিস্থিতিকে নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে জ্বালানি সংকট। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা-সংঘাতের প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায়। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক দীর্ঘ সারি, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে প্রাইভেট কার ও বাইক চালকদের। সড়কের একাংশ জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা তেলের লাইনে যুক্ত হচ্ছে শত শত যানবাহন, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের প্রতিটি মোড়ে। এই লাইনগুলো সরাসরি সড়কের অংশ দখল করে ফেলায় যান চলাচল আরও সীমিত হয়ে পড়ছে এবং আগের চেয়ে দীর্ঘ হচ্ছে যানজট। ফলে কর্মজীবী মানুষ সময়মতো পৌঁছাতে পারছেন না কর্মস্থলে, শিক্ষার্থীরা আটকে পড়ছে সড়কে, জরুরি সেবাও পড়ছে বিলম্বের মুখে। ভোগান্তির মাত্রাও চরমে পৌঁছেছে। খিলক্ষেতের একটি ফিলিং স্টেশনের কারণে সৃষ্ট দীর্ঘ যানজট ঠেকেছে ক্যান্টনমেন্ট ফ্লাইওভারে। ছবি: বাংলানিউজ। তেলের জন্য লাইন ও ট্রাফিক ব্যবস্থা ঃ রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও পয়েন্টে জ্বালানি সংকটকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি এখন সরাসরি ট্রাফিক ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে ডেমরা, যাত্রাবাড়ি, মতিঝিল, গুলিস্তান, শাহবাগ, মহাখালী, মিরপুর, তেজগাঁও, খিলক্ষেত ও উত্তরা; প্রায় প্রতিটি এলাকায় ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক দীর্ঘ যানবাহনের সারি নতুন করে তীব্র যানজটের জন্ম দিচ্ছে। সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে ভোর, কোনো কোনো সময় রাত থেকে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে সংখ্যায় অল্প হলেও আছে বাস, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান। অনেক ক্ষেত্রে এই সারি মূল সড়ক ছাড়িয়ে পাশের লেন দখল করে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও লাইনের দৈর্ঘ্য এক থেকে দুই কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে, যা সরাসরি যান চলাচলের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও মহাখালী-সংলগ্ন এলাকায় পরিস্থিতি বেশি জটিল। এখানে ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি নিতে অপেক্ষমাণ গণপরিবহন সড়কের একটি বড় অংশ দখল করে রাখছে। ফলে স্বাভাবিক গতিতে চলাচল করতে পারছে না অন্য যানবাহন। ধীরগতির এই চাপ দ্রুতই দীর্ঘ যানজটে রূপ নিচ্ছে এবং আশপাশের সড়কগুলোতেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে। একই চিত্র গুলিস্তান ও মতিঝিল এলাকার মতো বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতেও দেখা গেছে। অফিস সময়কে কেন্দ্র করে যখন সড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ে, তখন ফিলিং স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির সারি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে করে কয়েকশ মিটার এলাকার যানজট দ্রুত কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। খিলক্ষেতের ফিলিং স্টেশনের লাইন ঠেকে যাচ্ছে জিয়া কলোনি পর্যন্ত। আবার তেজগাঁওয়ের একটি ফিলিং স্টেশনের দীর্ঘ লাইন প্রধানমন্ত্রীর অফিস ছড়িয়ে চলে যাচ্ছে মহাখালী ফ্লাইওভার পর্যন্ত। ফলে বিমানবন্দর হয়ে উত্তরার দিকে যেতে সময় লাগছে বেশি। অন্যদিকে মহাখালী থেকে ফার্মগেটের দিকে যেতেও পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার কারণে বাসের দৈনিক ট্রিপ কমে যাচ্ছে। এতে সড়কে চলাচলরত বাসের সংখ্যা সাময়িকভাবে কমে গেলেও যেসব বাস লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, সেগুলোই উল্টো সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে যানজট কমার পরিবর্তে আরও দীর্ঘ হচ্ছে। যাত্রীরাও পড়ছেন দ্বিমুখী ভোগান্তিতে। একদিকে পর্যাপ্ত গণপরিবহন না পেয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অন্যদিকে যে বাসগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোও যানজটে আটকে থাকায় গন্তব্যে পৌঁছাতে লাগছে কয়েকগুণ বেশি সময়। জরুরি প্রয়োজনে বের হওয়া মানুষও পড়ছেন একই পরিস্থিতিতে। ট্রাফিক সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, ফিলিং স্টেশন ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের অভাব এবং সড়ক ব্যবহারে শৃঙ্খলার ঘাটতি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। নির্দিষ্ট লেন বা আলাদা সারি ব্যবস্থাপনা না থাকায় জ্বালানির জন্য অপেক্ষমাণ যানবাহন সরাসরি মূল সড়কে প্রভাব ফেলছে। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য-অভিযোগ ঃ জ্বালানি সংকট ঘিরে সড়কে সৃষ্ট দীর্ঘ যানজটের জন্য ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে ট্রাফিক সদস্যদের কার্যকর উপস্থিতি না থাকায় ফিলিং স্টেশনকেন্দ্রিক এই অরাজকতা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। মহাখালী এলাকায় কর্মজীবী এক যাত্রী বলেন, সকালে অফিসে যাওয়ার জন্য বাসে উঠি, কিন্তু ফিলিং স্টেশনের লাইনে বাস দাঁড়িয়ে থাকে প্রায় এক ঘণ্টা। আশপাশে কোনো ট্রাফিক পুলিশকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে দেখি না। সবাই নিজের মতো করে গাড়ি দাঁড় করিয়ে রাখে, এতে পুরো সড়ক বন্ধ হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মত ঃ এই সংকট শুধু রাস্তা বা অবকাঠামোর সমস্যা নয়; এটি মূলত দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও খারাপ অভ্যাসের ফল। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে চাপ থাকলেও, দেশের ভেতরে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে করতে হবে। গণপরিবহনকে নিয়মের মধ্যে আনতে হবে, চালক ও মালিকদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button