জ্বালানি তেলের ভোগান্তিতে কেমন আছে প্রতিবেশীরা

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রভাব তীব্রভাবে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। বাংলাদেশে পেট্রল পাম্পগুলোয় তেলের জন্য দীর্ঘ সারি দুদিন আগেও নিয়মিত ছিল। তবে সরকার জ্বালানি তেলে মূল্য বৃদ্ধি করায় পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে। একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালেও। জ্বালানি তেলের সংকট ও আকাশচুম্বী মূল্য এসব দেশগুলোর সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। বড় অর্থনীতি হওয়ায় ভারত বিকল্প উৎসের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও, সেখানেও চাপ বাড়ছে। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের সংবাদমাধ্যমগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোয় জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট, লাগাতার মূল্য বৃদ্ধি এবং এর সরাসরি প্রভাব হিসেবে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির চিত্র উঠে আসছে। কোথাও পাম্পে তেল পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, কোথাও পরিবহন খরচ বেড়ে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার চাপ; এই সংকট শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নেই বরং পুরো অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা ও আমদানিনির্ভরতার কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এই চাপ থেকে দ্রুত বের হতে পারছে না। প্রতিবেশী দেশগুলোর বর্তমান চিত্র ঃ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশ ভারত। দেশটির নুমালীগড় রিফাইনারি লিমিটেড থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ হয়। আসামের নুমালীগড় থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত এই পাইপলাইন চালু রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী ভারত থেকে রেল ও জলপথে পরিশোধিত জ্বালানি তেলও আমদানি করে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ ভারতেও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। ফলে দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে জ্বালানি তেল নিয়ে ‘প্যানিক’ সৃষ্টি হয়। এ অবস্থায় দেশটি জ্বালানি রপ্তানি কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দেশটির শীর্ষ গণমাধ্যমগুলো বলছে, নিজস্ব শোধনাগার সক্ষমতা থাকলেও ভারত নিজস্ব মোট চাহিদার প্রায় ৮৮ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘœ ঘটায় ভারত সরকার অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে জ্বালানি রপ্তানি কমিয়ে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও নেপাল, যারা জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এসব দেশে সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা আরও বেড়েছে। প্রভাবশালী দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমস তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে জানায়, সরকার প্রায় ৬০ দিনের জ্বালানি মজুত থাকার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে বিভিন্ন রাজ্যে চাপ বাড়ছে। গুজরাট, উত্তরপ্রদেশ ও গোয়ার মতো অঞ্চলে ‘প্যানিক বায়িং’ শুরু হয়েছে, যেখানে মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল কিনে মজুত করার চেষ্টা করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক পেট্রল পাম্পে মোটরসাইকেলের জন্য রেশনিংয়ের মাধ্যমে ২০০ রুপি এবং ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য রেশনিংয়ের মাধ্যম ২০০০ রুপি পর্যন্ত জ্বালানি কেনার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। গুজব ও অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক ঠেকাতে সরকার জনগণকে স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি কেনার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির জ্বালানি বিশ্লেষক অমিতাভ কান্ত ও আদিল রানা চিনা এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকে বড় ধরনের সংকটে ফেলতে পারে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় তারা দ্রুত পরিচ্ছন্ন জ্বালানির দিকে রূপান্তরের ওপর জোর দিয়েছেন। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা চালুর সুপারিশ করেছেন, যাতে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির ওপর চাপ কমানো যায়। তিন দেশের যুদ্ধ শুরুর পর সবচেয়ে বেশি নাজুক পরিস্থিতিতে পড়েছে পাকিস্তান। দেশটি যুদ্ধবিরতিতে জোর চেষ্টা করলেও নিজেদের জ্বালানি সংকট কার্যত রোধ করতে পারছে না। দেশটির প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ডন তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, এপ্রিলের শুরুতে দেশটিতে জ্বালানির দাম এক ধাক্কায় ৪২ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে সারা দেশে পেট্রল পাম্পগুলোয় কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানবাহনের সারি তৈরি হয়েছে। অনেক এলাকায় সরবরাহ সংকট এতটাই তীব্র যে পাম্পগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়মূলক একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করা হয়েছে, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ নীতি উৎসাহিত করা হচ্ছে, এমনকি স্কুল বন্ধ রাখার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও নিতে হয়েছে। তবুও জ্বালানির সরবরাহ ও মূল্যচাপ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে। পাকিস্তানের জ্বালানি অর্থনীতি বিশ্লেষক আতিফ জাকা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান সংকট সামাল দিতে পাকিস্তানকে দ্রুত জ্বালানি ব্যবহারের কাঠামো বা ‘ফুয়েল মিক্স’ পরিবর্তনের দিকে যেতে হবে। তিনি আমদানিনির্ভরতা কমাতে পেট্রলের সঙ্গে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ইথানল মিশ্রণের কর্মসূচি দ্রুত চালুর ওপর জোর দিয়েছেন, যাতে বিকল্প উৎস ব্যবহার করে জ্বালানির ওপর চাপ কমানো যায়। অর্থনৈতিক সংকটের ক্ষত পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠার আগেই শ্রীলঙ্কা নতুন করে জ্বালানি সংকটে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের মার্চের মাঝামাঝি থেকে দেশটিতে সরবরাহ পরিস্থিতি আবারও চাপের মুখে পড়ে। প্রভাবশালী পত্রিকা ডেইলি মিরর জানিয়েছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু করেছে এবং প্রতি বুধবার সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে। সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এবং মজুত ধরে রাখতে পুনরায় চালু করা হয়েছে ডিজিটাল কিউআর কোডভিত্তিক ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাস’ রেশনিং ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তবে এসব পদক্ষেপের পরও রাজধানী কলম্বোসহ বড় শহরগুলোয় পেট্রল পাম্পের সামনে দীর্ঘ যানবাহনের সারি দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সিলন পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (সিপিসি) মে মাস পর্যন্ত পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত থাকার আশ্বাস দিলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে বাজারে চাপ আরও বাড়ছে এবং সংকটের প্রভাব জনজীবনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নেপালের জ্বালানি সরবরাহ সংকট মূলত ভারতের ওপর উচ্চ নির্ভরশীলতার কারণে আরও তীব্র হয়েছে। ভারত থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় কাঠমান্ডুসহ দেশের প্রধান শহরগুলোয় পেট্রল পাম্পের সামনে দীর্ঘ যানবাহনের সারি তৈরি হয়েছে। দেশটির বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ও পরিবহন খরচে সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নেপাল সরকার তাৎক্ষণিকভাবে সপ্তাহে দুই দিন, শনিবার ও রবিবার, সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণা করেছে, যাতে জ্বালানি ব্যবহার কিছুটা কমানো যায়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সংস্থা নেপাল অয়েল কর্পোরেশন ভারতের সরবরাহ চ্যানেলের ওপর তীক্ষè নজর রাখছে, যাতে সংকট আরও গভীর না হয় এবং নিয়মিত সরবরাহ বজায় রাখা সম্ভব হয়।



