সমালোচনা করলে বাসা থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে : হাসনাত

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ক্যাম্পাসগুলো আবার অস্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে। অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। বিরোধীদল-মত দমনের জন্য মামলা করা হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে ফেসবুকে লেখার কারণে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসা হচ্ছে। হুইপকে সমালোচনা করলে বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসা হচ্ছে। আবার আমরা আগের সংস্কৃতিতে চলে যাচ্ছি। রোববার (২৬ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ। হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নিজে কার্টুন শেয়ার করে বিভিন্ন স্যাটায়ার, বিভিন্ন মকারি প্রমোট করছেন, বিরোধী মতকে প্রমোট করছেন; সেখানে এই সংসদ গঠিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত নয়টি ঘটনা ঘটেছে, যেখানে মতপ্রকাশের জন্য বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে। আমরা খুব আশাহত হইÑএত রক্ত, এত লড়াই, এত ত্যাগের পরে আজ যখন এই সংসদ গঠিত হয়েছে, কিন্তু এই সংসদ আবার আগের সেই বিষাক্ত সাইকেল, দোষারোপের সাইকেল, একজন আরেকজনকে বিভিন্ন ট্যাগিংয়ের সাইকেল, বিরোধী মত দমনের নামে মামলার যে সাইকেল; সেখানে আবার আমরা ফিরে গেছি। তিনি বলেন, আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চাই। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আগেও ছিল। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আওয়ামী লীগের সময়েও ছিল। তবে সেটা সহমত প্রকাশের স্বাধীনতা। আমরা এই পার্লামেন্টের পরে শুধুমাত্র মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়, আমরা দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই। আমরা এখানে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে চাই। আমরা ফেসবুকে ব্যাকস্পেস ব্যবহার করতে চাই না। কিন্তু আবার একটি ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আবার একটি আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমরা দেখলাম, সিলেক্টিভ এক ধরনের বিরোধিতার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সমাজের যারা গ্রহণযোগ্য এক ধরনের পলিটিক্যালি এলিট শ্রেণির নারী, তাদের নিয়ে যখন সমালোচনা করা হয়, তখন সেটাকে নারীদের বিরুদ্ধে হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু যারা পলিটিক্যালি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, গার্মেন্টস কর্মী, যারা এই দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে, গ্রামগঞ্জের নারীরা, মায়েরা যারা রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে, তাদের যখন গালি দেওয়া হয়, সেটাকে আমরা নারী বিরোধিতা হিসেবে আমলে নেই না। এই ধরনের সিলেক্টিভ নারী বিরোধিতা, এই ধরনের সিলেক্টিভ নারী সমালোচনার প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। হাসনাত বলেন, আজকে ক্যাম্পাসগুলোতে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের সময় গেস্টরুম, গণরুমের কালচার ছিল। আমাদের সময় শিক্ষার্থীরা অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেত। আমরা সেখানে দেখেছিÑক্ষমতাসীন দল কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তাদের পুঁজি করে, তাদের ক্ষমতার কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদি করার জন্য বাধ্যতামূলক রাজনীতি করাতো। আজকে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবার গেস্টরুম-গণরুম কালচার চালু করার প্রয়াস শুরু হয়েছে। আবার সেখানে বাধ্যতামূলক রাজনীতির কালচার শুরু করা হচ্ছে। আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন যারা রয়েছে তারা তাদের সন্তানদের বিদেশে রেখে নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে। আর মধ্যবিত্তের সন্তানরা যাদের বাবা-মা কলকারখানায় কাজ করে, ক্ষমতার রাজনীতিবিদরা তাদের সন্তানদের ব্যবহার করে, তাদের ক্যারিয়ার ঝুঁকিতে ফেলে, নিজেদের ক্ষমতা শক্ত করার জন্য; আর নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ বিদেশে রেখে নিরাপদে রাখে, অন্যের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। আমরা এই সংস্কৃতির পরিবর্তন চাই। আমরা চাইÑবিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু নেতা তৈরির হাতিয়ার হবে না। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাঠচর্চা, মনস্তাত্ত্বিক সমৃদ্ধি এবং গবেষণার জায়গা হবে। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বুদ্ধিজীবী গবেষক বাংলাদেশকে এবং জাতিকে উপহার দিতে পারব। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়, আজকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু নেতা উৎপাদনের একটি বিশেষ সার্কেলে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, আজ মানবাধিকার কমিশনকে ল্যাপস করে দেওয়া হয়েছে। বারবার বলা হচ্ছে, আরও শক্তিশালীভাবে মানবাধিকার কমিশন উত্থাপন করা হবে। আজ পুলিশ সংস্কার কমিশনের অর্ডিন্যান্স বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে এটি সংসদে উত্থাপন করা হবে। যদি সদিচ্ছা থাকত, তবে অর্ডিন্যান্সটি গ্রহণ করে পরবর্তীতে সংশোধন করা যেত। আমাদের জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণের আশা, সময় ও স্বপ্নগুলোকে রাজনৈতিক ভাষা ও কর্মসূচির মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য আমাদের সবাইকে সমন্বিতভাবে, ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আবার যদি আমরা বিভাজনের রাজনীতিতে যাই, তাহলে সেখান থেকে বিএনপি উপকৃত হবে না, এনসিপি হবে না, জামায়াতে ইসলামও উপকৃত হবে না; বরং জুলাইয়ে যাদের আমরা পরাজিত করেছি, তারাই উপকৃত হবে।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, নির্মূলের রাজনীতি, বিনাশের রাজনীতি, দমনের রাজনীতি, পীড়নের রাজনীতি যদি আমরা বাংলাদেশে আবার পরিচয় করাই, তাহলে সেখান থেকে এই সংসদের কেউ উপকৃত হবে না। উপকৃত হবে সেই অপশক্তি, যারা এই বাংলাদেশকে ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।



