অবৈধ বালু উত্তোলন-মাটি কাটায় দক্ষিণাঞ্চলে বাড়ছে নদীভাঙনের আতঙ্ক

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ বর্ষা মৌসুম শুরু হতেই বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে দেখা দিয়েছে নদীভাঙনের আতঙ্ক। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রি, উজানের পানির চাপ এবং অপরিকল্পিত নদীশাসনের কারণে প্রতিবছরই ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে ফসলি জমি, বাগান, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সরকারি-বেসরকারি নানা স্থাপনা হুমকির মুখে পড়ছে। নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা বর্ষার শুরু থেকেই ভাঙনের আশঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। বানারীপাড়া উপজেলার সন্ধ্যা নদীতীরের বাসিন্দা জামাল বলেন, নদীভাঙনের আতঙ্কে পরিবারের কেউ না কেউ প্রতি রাতেই জেগে থাকেন। একসময় নদী বাড়ি থেকে এক কিলোমিটারেরও বেশি দূরে ছিল, এখন তা ঘরের পাশেই। কখন নদী পৈতৃক ভিটা গিলে খাবে, তা কেউ বলতে পারে না। নদীভাঙন রোধের দাবিতে বিভিন্ন এলাকায় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করছেন স্থানীয়রা। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সরকার বিভাগের কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান না হওয়ায় হতাশ তারা। হিজলা উপজেলার মান্দ্রা চরকুশরিয়া গ্রামের প্রবীণ হযরত আলী বলেন, বর্ষা মৌসুমে মেঘনা নদীতে পানি ও স্রোত বেড়ে যাওয়ায় ভাঙন কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় অনেক জমির মালিক আগেভাগেই জমির মাটি ইটভাটায় বিক্রি করে দেন। এছাড়া প্রভাবশালীরা খাসজমির মাটিও কেটে নিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়দের দাবি, গত পাঁচ বছরে হিজলা উপজেলার গৌরবদী ইউনিয়নের প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা মেঘনা নদীতে বিলীন হয়েছে। একই এলাকার বাসিন্দা জাহের মোল্লা বলেন, সারা বছরই মেঘনা নদী থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং ভাঙন বাড়ছে। অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ না হলে এ সমস্যা আরও প্রকট হবে। বাকেরগঞ্জ উপজেলার কারখানা ও পা-ব নদীর তীরবর্তী এলাকায় সম্প্রতি গোপনে অবৈধভাবে মাটি কাটার অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন অভিযান চালালেও প্রভাবশালী একটি চক্র নানা কৌশলে নদীতীরের মাটি কেটে ইটভাটায় সরবরাহ করছে। মেহেন্দিগঞ্জেও ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের কাছ থেকে কম দামে জমির মাটি কিনে কেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ভাঙনের ভয়ে মানুষ ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার পর একটি চক্র অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে জমির মাটি কেটে নেয়। এতে সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাও আগাম ঝুঁকির মুখে পড়ে। বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. মুনিমের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর তিন নদীর মোহনার ঝুনাহার এলাকায় ৮ থেকে ১০টি ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়। এর প্রভাব চরবাড়িয়া এলাকায় পড়ছে এবং দিন দিন নদীভাঙন বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় আহ্বায়ক রফিকুল আলম বলেন, নদীভাঙনের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে উজানের পানির প্রবাহ কম থাকায় নদীর তলদেশে পলি জমে। বর্ষায় হঠাৎ পানির প্রবাহ বেড়ে গেলে নদী সেই চাপ ধারণ করতে না পেরে তীর ভাঙতে শুরু করে। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের ইজারার আওতায় কিংবা অবৈধভাবে অতিরিক্ত ড্রেজিংয়ের ফলে নদীর তলদেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও নদী দখল করে স্থাপনা গড়ে তোলার কারণে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হচ্ছে। এতে ভাঙন আরও তীব্র হচ্ছে। শুধু জিওব্যাগ বা কংক্রিট ব্লক ফেললেই সমস্যার সমাধান হবে না। নদীর গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে তীররক্ষা ব্যবস্থা নিতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল জেলার ৩৮টি নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে চলতি বর্ষা মৌসুমে প্রায় ২৮ কিলোমিটার এলাকা ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৫ কিলোমিটার এলাকাকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাবেদ ইকবাল বলেন, অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৫ কিলোমিটার এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে তীররক্ষা কাজ চলছে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য এলাকায় স্থায়ী তীররক্ষা প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে কাজ শুরু হবে। তবে প্রকৌশলীরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত ড্রেজিং ও অবৈধভাবে মাটি কাটা বন্ধ না হলে শুধু নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে নদীভাঙন কার্যকরভাবে রোধ করা সম্ভব হবে না।



