অর্থবছরের সময়সীমা বদলানোর উদ্যোগ : সুফলের সঙ্গে থাকছে বড় চ্যালেঞ্জ

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ দেশে ৫৫ বছর পর অর্থবছরের সময়সীমায় পরিবর্তনের একটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রচলিত জুলাই-জুন সময়ের পরিবর্তে অর্থবছর গণনায় এপ্রিল-মার্চ সময়সীমা নির্ধারণের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে শিগগিরই মন্ত্রিসভার বৈঠকে একটি প্রস্তাব তোলা হবে বলে জানা গেছে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে প্রয়োজনীয় আইন, বিধি ও প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন এনে আগামী অর্থবছর থেকেই নতুন সময়সীমা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে অর্থবছরের সময় তিন মাস এগিয়ে নিলেই বাজেট বাস্তবায়নের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটবে বলে মনে করেন না অর্থনীতিবিদেরা। তাদের মতে, সময় পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজস্ব আদায়, সরকারি হিসাব পরিচালনা, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সরকারি ক্রয় ও অর্থছাড় ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে। তা না হলে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নির্দেশে মন্ত্রণালয়ের বাজেট অনুবিভাগ এ পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। অর্থবছর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাজেট প্রণয়ন, রাজস্ব আদায়, করব্যবস্থা, সরকারি হিসাবরক্ষণ, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও অর্থছাড়ের পদ্ধতিতে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন হবে, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলানিউজকে বলেন, প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় ওঠার আগে বিভিন্ন পর্যায়ে মতামত নেওয়া হবে। বর্তমান অর্থবছর কীভাবে শেষ হবে এবং নতুন অর্থবছরের সঙ্গে চলমান বাজেটের সমন্বয় কীভাবে করা হবে, সেটিও নির্ধারণ করতে হবে। প্রাথমিকভাবে আগামী বছরের এপ্রিল, মে ও জুনÑএই তিন মাসে দুই অর্থবছরের কিছু কার্যক্রম পাশাপাশি চলার সম্ভাবনা রয়েছে। সময়সীমা পরিবর্তনে যেসব সুফল মিলবে ঃ জানা গেছে, অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ করার পেছনে সরকারের অন্যতম বড় যুক্তি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচির সঙ্গে একটি সমন্বয় সাধন করা। বর্তমানে অর্থবছরের শেষ তিন মাস এপ্রিল থেকে জুনে দেশে বর্ষা শুরু হওয়ায় সড়ক, সেতু, পানি উন্নয়ন ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পের কাজে ধীর গতি নেমে আসে। অন্যদিকে, অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে বরাদ্দের অর্থ খরচে তড়িঘড়ি দেখা যায়। এতে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা দেখা দেয়। অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ হলে শেষ তিন মাস পড়বে জানুয়ারি থেকে মার্চে। ফলে বর্ষাকাল অর্থবছরের শেষ প্রান্ত থেকে সরে যাবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এতে প্রকল্পের পরিকল্পনা, দরপত্র আহ্বান, কার্যাদেশ, নির্মাণকাজ ও বিল পরিশোধের সময়সূচি আরও বাস্তবসম্মতভাবে সাজানোর সুযোগ তৈরি হবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, অর্থবছর পরিবর্তন উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থবছরের শেষদিকে তড়িঘড়ি ব্যয়ের চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু শুধু সময়সীমা বদলালেই সরকারি অর্থের অপচয় কিংবা প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা বন্ধ হবে না। এ জন্য প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড়, সরকারি ক্রয় এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের পুরো কাঠামোয় সংস্কার প্রয়োজন। প্রকল্পের শুরুতেই সঠিক পরিকল্পনা এবং সময়মতো অর্থছাড় নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন ঃ অর্থবছর জুলাই-জুন থেকে পরিবর্তন করলেই বাজেট বাস্তবায়নে বড় ধরনের গুণগত পরিবর্তন হবে না বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বাংলানিউজকে বলেন, অর্থবছর পরিবর্তনের ফলে বর্ষাকালজনিত কিছু প্রতিবন্ধকতা এড়ানো সম্ভব হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বলতা, অস্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি থেকেই যাবে। ‘জুলাই-জুন অর্থবছরে প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুর সময়ে বর্ষাকাল থাকায় কিছুটা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। ফলে অর্থবছরের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রান্তিকে অনেক প্রকল্পে প্রত্যাশিত মাত্রায় কাজ হয় না। তবে অর্থবছর তিন মাস এগিয়ে দিলে শুধু বর্ষাকালের অবস্থান পরিবর্তন হবে,’ যোগ করেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। সিপিডির এই গবেষণা পরিচালক বলেন, অধিকাংশ প্রকল্পেই বারবার মেয়াদ বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আগে কোনো প্রকল্পে একবার মেয়াদ বাড়ানো হলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে তিনবার পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ছে। এতে প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা দুর্বলতার কারণে প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে এবং অপচয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রথমবারের বর্ষাকালটা হয়তো এড়িয়ে গেলেন। কিন্তু বারবার প্রকল্প সংশোধন, সময় বাড়ানো ও ব্যয় বাড়ানোর যে প্রবণতা, তার সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা জড়িত। সেগুলো সমাধান না করে শুধু তিন মাস এগিয়ে দিলে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পুরো বাজেটের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। বাকি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ব্যয় মূলত পরিচালন বা রাজস্ব বাজেটের আওতায় পড়ে, যার সঙ্গে অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের সম্পর্ক খুবই সীমিত। ফলে অর্থবছরের সময় পরিবর্তন করে বাজেটের সামগ্রিক গুণগত সমস্যার সমাধান করা যাবে না। অতিরিক্ত ব্যয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, বেশি ঋণ নেওয়া এবং ঋণের সুদ পরিশোধের চাপÑএসব সমস্যার সঙ্গে অর্থবছরের তিন মাস এগিয়ে বা পিছিয়ে দেওয়ার সরাসরি সম্পর্ক নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতাও এক নয় বলে উল্লেখ করে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, শিল্প, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো কিছু মন্ত্রণালয় ঐতিহাসিকভাবেই বাজেট বাস্তবায়নে দুর্বল। আবার স্থানীয় সরকার ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মতো কিছু মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন সক্ষমতা তুলনামূলক ভালো। এসব পার্থক্যের পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে, যার সঙ্গে বর্ষাকাল বা অর্থবছরের সময়ের সম্পর্ক খুব বেশি নয়। বাজেট বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগে ব্যয় কাঠামোয় সংস্কার আনার পরামর্শ দিয়েছেন খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, এডিপিতে নেওয়া প্রকল্পগুলোর অতিরিক্ত ব্যয় নির্ধারণের প্রবণতা কমাতে হবে। প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ই-প্রকিউরমেন্ট চালু থাকলেও একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বারবার প্রকল্পের কাজ পাচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়াতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া হলেও যেসব প্রকল্পের বিনিয়োগের বিপরীতে পর্যাপ্ত রিটার্ন নেই, সেগুলো বাদ দেওয়ার পরামর্শ তাঁর। এ ছাড়া শুধু যে দেশ বা উৎস থেকে সহজে ঋণ পাওয়া যায়, সেই বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণের প্রবণতা বন্ধ করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কম রিটার্নের প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ভবিষ্যতে সরকারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়। বারবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো ও সংশোধনের প্রবণতা কমাতে প্রকল্প পরিচালকদের জবাবদিহির আওতায় আনারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। অর্থবছর পরিবর্তনের উদ্যোগকে পুরোপুরি নাকচ না করলেও এর পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি ও অর্থনৈতিক সুফলের সমীক্ষা থাকতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ, পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান আবু আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সরকার যদি যথেষ্ট যুক্তি দাঁড় করাতে পারে, তাহলে এর বিরোধিতার কোনো কারণ নেই। তবে কেন সরকারের এই ধারণা এসেছে, তা আমার জানা নেই।’ বর্ষাকালের কারণে অর্থবছরের শুরুতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় নষ্ট হওয়ার যুক্তির বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন আবু আহমেদ। তিনি বলেন, বর্ষাকাল তো দেশে থাকবেই। অর্থবছর তিন মাস এগিয়ে আনলে বর্ষাকাল চলে যাবে না। বরং যে সময়ে কাজ করা যাবে না, সেই সময়টা অর্থবছরের শেষের দিকে চলে যাবে। তাহলে লাভটা কী? তিনি বলেন, অর্থবছরের মেয়াদ ১২ মাসই থাকবে। তাই শুধু সময় পরিবর্তন করলেই প্রকল্প বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় পাওয়া যাবে না। আগের অর্থবছর জুন-জুলাই হলে যে নয় মাস কাজ করা সম্ভব ছিল, নতুন সময়সূচি করলেও বর্ষার কারণে তিন মাস কাজ করা যাবে না। ফলে মোট কাজের সময় তো বাড়ছে না। অর্থবছর পরিবর্তনের উদ্যোগ আগেও ছিল ঃ দেশে অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের আলোচনা নতুন নয়। ২০১০ সালেও জুলাই-জুনের পরিবর্তে অন্য সময়সীমায় অর্থবছর নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। এবারও অর্থবছর পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেট নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী জুলাই-জুনের পরিবর্তে জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর করার প্রস্তাব দিয়েছিল। দলটির প্রস্তাবিত ছায়া বাজেটেও এ বিষয়ে সুপারিশ ছিল। জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও ক্যালেন্ডার বছর অর্থাৎ জানুয়ারি-ডিসেম্বরকে অর্থবছর হিসেবে বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার যুক্তি ছিল, বর্তমান কাঠামোর কারণে অর্থবছরের শেষদিকে অনেক সময় শুধু বিল সমন্বয়ের জন্য কাজ শেষ করার প্রবণতা তৈরি হয়। অর্থবছর পরিবর্তনের আগে এর অর্থনৈতিক সুফল নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক আবু আহমেদ। তিনি বলেন, এতদিন এটা চলে এসেছে। দেশের অধিকাংশ কোম্পানির আর্থিক বছর জুন-জুলাইকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। এ কারণে বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আবু আহমেদ বলেন, সরকার যদি মনে করে অর্থবছর পরিবর্তন করলে ভালো হবে, তাহলে কোন কোন দেশে এ ধরনের ব্যবস্থা আছে, তা খুঁজে দেখা উচিত। ইংল্যান্ড ও ইউরোপের দেশগুলোতে কীভাবে অর্থবছর পরিচালিত হয়, সেটিও পর্যালোচনা করা দরকার। কোন দেশে কোন সময়ে অর্থবছর ঃ প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ভারত, জাপান, কানাডা, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকায় এপ্রিল–মার্চ সময়কে অর্থবছর হিসেবে ধরা হয়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, মিসর এবং পূর্ব আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ জুলাই–জুন সময়ে অর্থবছর গণনা করে। চীন, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশ জানুয়ারি–ডিসেম্বর সময়ে অর্থবছরের কার্যক্রম পরিচালনা করে। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার, থাইল্যান্ড, হাইতি এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো অক্টোবর–সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়কে অর্থবছর হিসেবে ধরে। প্রসঙ্গত, যুক্তরাজ্যের সরকারি অর্থবছর ১ এপ্রিল-৩১ মার্চ। তবে যুক্তরাজ্যের ব্যক্তিগত করবর্ষ ৬ এপ্রিল–৫ এপ্রিল পর্যন্ত। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরকারি অর্থবছর ১ জুলাই–৩০ জুন হলেও ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করবর্ষ ১ জানুয়ারি–৩১ ডিসেম্বর। আছে চ্যালেঞ্জ, বদলাতে হবে অনেক কিছু ঃ অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থছাড়, সরকারি ক্রয় এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের পুরো কাঠামোয় সংস্কার প্রয়োজন। অর্থবছরের শেষদিকে ব্যয়ের চাপ কমানোর পাশাপাশি প্রকল্পের শুরুতেই সঠিক পরিকল্পনা ও সময়মতো অর্থছাড় নিশ্চিত করতে হবে। ফলে সরকারের সামনে শুধু অর্থবছর তিন মাস এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়; বরং নতুন সময়সীমার সঙ্গে রাজস্ব, বাজেট, সরকারি হিসাব, উন্নয়ন প্রকল্প ও সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে সামঞ্জস্য করার বড় ধরনের প্রশাসনিক সংস্কারের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অর্থবছরের সময় পরিবর্তনকে শুধু ক্যালেন্ডারের তিন মাস এগিয়ে নেওয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে দেশের পুরো সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের পরিবর্তন জড়িত। বর্তমানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। ১ জুলাই থেকে এ বাজেট কার্যকর হয়েছে। সরকারের রাজস্ব আদায় ও ব্যয়ের পুরো পরিকল্পনাই জুলাই-জুন কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। নতুন অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ করা হলে চলমান অর্থবছরের হিসাব কখন বন্ধ হবে, নতুন অর্থবছর কত মাসের হবে এবং চলমান বাজেটের সঙ্গে নতুন সময়সীমার সমন্বয় কীভাবে করা হবে, এসব প্রশ্নের সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে আয়কর রিটার্ন, ভ্যাট, সরকারি হিসাব, বাজেট প্রণয়ন, বার্ষিক প্রতিবেদন ও সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সফটওয়্যারেও পরিবর্তন আনতে হবে। মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বার্ষিক কর্মসম্পাদন সূচক, ক্রয় পরিকল্পনা এবং প্রকল্পের অর্থছাড়ের সময়সূচিও নতুন অর্থবছরের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। অর্থবছর পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পেও। যেসব প্রকল্পের মেয়াদ জুলাই-জুন ধরে নির্ধারিত, সেগুলোর সময়সীমা কীভাবে নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দরপত্র, কার্যাদেশ, কাজের সময়সীমা ও বিল পরিশোধের চক্রও বদলাতে হবে। বর্তমানে অর্থবছরের শেষদিকে বিল পরিশোধের যে চাপ তৈরি হয়, তা নতুন ব্যবস্থায় মার্চের দিকে চলে আসবে। ফলে বছরের কোন সময়ে দরপত্র হবে এবং কখন কাজের গতি বাড়াতে হবে, তা নতুন করে পরিকল্পনা করতে হবে। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ প্রথমবার একই সঙ্গে দুই অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছিলেন। ১৯৭১-৭২ অর্থবছরের বাজেটের মেয়াদকাল ছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ৩০ জুন। ওই অর্থবছরের বাজেটে ব্যয় ধরা হয় ৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এরপর থেকে নিয়মিত জুলাই-জুন সময়ে বাজেট প্রস্তাব গৃহীত ও বাস্তবায়িত হয়ে আসছে।


