‘লাশটির শরীরে জমাট বাঁধা সিমেন্টের বস্তা বাঁধা ছিল’

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নিজাম উদ্দিন হাওলাদার। রোববার (২৩ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই জবানবন্দি দেন। এরপর জিয়াউল আহসানের আইনজীবীরা তাকে জেরা করেন। গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর জিয়াউলের বিরুদ্ধে শতাধিক মানুষকে গুম করে হত্যার ঘটনায় তিনটি অভিযোগ এনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছিল প্রসিকিউশন। এরপর ১৪ জানুয়ারি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। জিয়াউল আহসান সর্বশেষ টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের আগস্টের মাঝামাঝিতে তিনি গ্রেপ্তার হন। জবানবন্দিতে নিজাম উদ্দিন হাওলাদার বলেন, ২০১০ সালের ১৭ মে অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হিসেবে বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানায় কর্মরত ছিলাম। ওই তারিখে আমি সরকারি বিশেষ কাজে পুলিশ সুপারের কার্যালয় বাগেরহাটে যাই। বেলা অনুমান ৩টার পর শরণখোলা থানার একজন চৌকিদার আমাকে ফোন দিয়ে জানায় যে, বলেশ্বর নদীর পশ্চিম তীরে একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির লাশ পড়ে আছে। ওই এলাকাটির নাম চাল রায়েন্দা। লাশটির শরীরে জমাট বাঁধা সিমেন্টের বস্তা বাঁধা ছিল। লাশটি ডিকম্পোজড (গলিত) ছিল। লাশের পেট কাঁটা ছিল। মাথাটি কাপড় দিয়ে ঢাকা ছিল। লাশের হাত পা বাঁধা ছিল। এইসব কথাগুলো আমাকে উক্ত চৌকিদার ফোনের মাধ্যমে জানায়। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি থানার দায়িত্বে থাকা এসআই ইকবালকে জানাই। তাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলি। এসআই ইকবাল জিডিমূলে ঘটনাস্থলে গমন করেন। লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। ময়না তদন্তের জন্য লাশটি সদর হাসপাতাল বাগেরহাটে প্রেরণের ব্যবস্থা করেন। সন্ধ্যা হওয়ায় লাশটি থানায় নিয়ে আসেন। ওই দিন লাশটি আর সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়নি। চৌকিদার বাদী হয়ে একটি এজাহার দায়ের করলে এসআই ইকবাল একটি নিয়মিত হত্যা মামলা রুজু করেন এবং নিজেই তদন্তভার গ্রহণ করেন। আমি রাতে থানায় ফিরে লাশটি দেখি। লাশটিতে পচন ধরায় আমি শুধু লাশের বাহ্যিক অবস্থা দেখি। পরের দিন সকালে লাশ ময়না তদন্তের জন্য সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। ময়না তদন্তের পর, লাশটি অজ্ঞাত বিধায়, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করা হয়, বলেন নিজাম উদ্দিন হাওলাদার। পুলিশের সাবেক এ কর্মকর্তা আরও বলেন, অনুমান দুই দিন পর এক ব্যক্তি আমাকে ফোন দেন। ওই ব্যক্তি দাবি করেন যে, প্রাপ্ত লাশটি তার ভাইয়ের। তিনি আরও জানান যে, অনুমান ২/৩ মাস পূর্বে গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়া থেকে তার ভাই অপহৃত হন। তিনি আরও জানান যে, এ সংক্রান্তে কোটালীপাড়া থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেছেন। আমি তাদের থানায় আসতে বলি। অতঃপর ৪/৫ দিন পর ওই মৃত ব্যক্তির দুই ভাই, স্ত্রী এবং চাচা থানায় আসেন। থানায় রক্ষিত মৃত ব্যক্তির শার্ট ও প্যান্ট দেখে তাকে শনাক্ত করেন। আগত সবাই দাবি করেন, মৃত ব্যক্তি তাদের আত্মীয়। মৃত ব্যক্তির স্ত্রী দাবি করেন লাশটি তার স্বামীর। তারা লাশের দাফন সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। আমি তাদের জানাই যে, অজ্ঞাত হওয়ার কারণে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি বাগেরহাট কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তারা লাশটি নিজেদের এলাকায় নেওয়ার ব্যবস্থা করতে চান। আমি তাদের বলি যে, ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে লাশটি নিতে পারবেন। লাশটি সম্পর্কে থানায় আগত ব্যক্তিরা বলেন, লাশটি একজন সাবেক বিডিআর সদস্যের। তার নাম নজরুল ইসলাম। পিলখানা ঘটনার পর তিনি পলাতক অবস্থায় গোপালগঞ্জের একটি ক্লিনিকে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। জবানবন্দিতে নিজাম উদ্দিন হাওলাদার আরও বলেন, লাশ প্রাপ্তির ৪/৫ দিন পর খুলনা বিডিআর সেক্টর থেকে একজন কর্নেল পত্রিকার মাধ্যমে জেনে, ফোন দিয়ে লাশের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চান। তিনি আরও বলেন যে, একজন বিডিআর সদস্য আসবে, তাকে যেন আমি কাগজপত্র দিয়ে সহায়তা করি। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে তিনিও ডিএনএ পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে চান। থানায় আগত ব্যক্তিরা ডিএনএ টেস্টের জন্য রাজি হন। এই ঘটনার দুই সপ্তাহ পর আমি বদলি সূত্রে রামপাল থানায় চলে যাই। শরণখোলা থানায় আমি ১১ মাস চাকরি করেছি। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে আমি অনুমান ছয় বছর চাকরি করেছি। সমসাময়িক সময়ে আমি পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি যে, ওই সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের লাশ পাওয়া যাচ্ছিল।



