বিনোদন

২৫ বছরেও অমলিন দলছুটের ‘হৃদয়পুর’

প্রবাহ বিনোদন: বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে কিছু অ্যালবাম আছে, যেগুলো সময় পেরিয়েও পুরোনো হয় না। ২০০০ সালে প্রকাশিত দলছুটের অ্যালবাম ‘হৃদয়পুর’ ঠিক তেমনই এক সৃষ্টি। এক চতুর্থাংশ শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এই অ্যালবামের গানগুলো এখনো শ্রোতাদের অনুভূতির ভেতরে জীবন্ত হয়ে আছে। ১৯৯৭ সালে ‘আহ!’ অ্যালবাম দিয়ে দলছুটের যাত্রা শুরু হলেও ‘হৃদয়পুর’ প্রকাশের পরই ব্যান্ডটির পরিচিতি পৌঁছে যায় অন্য উচ্চতায়। মোট ১২টি গান নিয়ে তৈরি এই অ্যালবামটি শুধু জনপ্রিয়ই হয়নি, বরং বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ভাষা ও অনুভূতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। সঞ্জীব চৌধুরী ও বাপ্পা মজুমদার এখানে প্রথাগত হার্ড রকের পথে হাঁটেননি। তাঁরা বাংলা গানের মেলোডিকে কেন্দ্র করে পপ ও ফোকের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। কোথাও কোথাও যুক্ত হয়েছে সফট বা মেলো রকের ছোঁয়া। এই সংযমী সংগীতভাবনাই ‘হৃদয়পুর’-কে আলাদা করে তুলেছে। শাহ আবদুল করিমের ‘গাড়ি চলে না’ গানটিতে পপ ও ফোকের এক অনন্য সমন্বয় ঘটে। মুক্তির সময় যেমন গানটি মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে, আজও তেমনি আড্ডা বা স্মৃতিচারণায় এই গান গুনগুন করে ওঠে। ‘চড়িয়া মানবগাড়ি যাইতেছিলাম বন্ধুর বাড়ি’ লাইনগুলো এখনো শ্রোতাদের কাছে সমান জীবন্ত। বাপ্পা মজুমদারের গাওয়া ‘বাজি’ তরুণ শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নেয় সফট রকের আবেশে। আবার ‘জলের দামে’ গানটি নিঃসঙ্গতার প্রতীক হয়ে ওঠে নগরজীবনের মানুষের কাছে। ‘এখন এমন কেউ নেই যে আমার, আঁধার এলে খুলে দেবে দুয়ার’ এই লাইনগুলো যেন সময়ের সঙ্গে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। শেখ রানার লেখা ‘বৃষ্টি’ ও ‘গাছ’ গান দুটো আলাদা করে মনোযোগ কাড়ে। বিশেষ করে ‘গাছ’ গানটির কথায় স্মৃতি, প্রকৃতি আর জীবনের চিহ্ন একাকার হয়ে যায়। ‘একটি গাছ’ হয়ে ওঠে মানুষের জীবনের নীরব সাক্ষী। ‘চাঁদের জন্য গান’-এ সঞ্জীব চৌধুরীর কণ্ঠে তৈরি হয় এক অপার্থিব অনুভূতি। এখানে চাঁদ কেবল আকাশের নয়, হয়ে ওঠে দূরের ভালোবাসা, অধরা স্বপ্ন বা জীবনের আলো। অন্যদিকে ‘সবুজ যখন’ গানে হালকা জ্যাজ ফ্লেভার এনে দেয় ভিন্নরকম সজীবতা। ‘নৌকা ভ্রমণ’ গানটি উৎসব আর প্রকৃতির কাছাকাছি ফিরে যাওয়ার আনন্দ তুলে ধরে। আর ‘চল বুবাইজান’ গানটি সহজ ভাষায় শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রামের গল্প বলে, যেখানে ব্যঙ্গের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তীব্র বাস্তবতা। ‘আন্তর্জাতিক ভিক্ষা সংগীত’-এ হাস্যরসের ছলে ফুটে ওঠে সামাজিক বৈষম্যের করুণ ছবি। এই গানটি যেমন হাসায়, তেমনি ভাবায়। সঞ্জীব চৌধুরীর কথায় বাপ্পা মজুমদারের কণ্ঠে ‘আমার সন্তান’ গানটি খুলে দেয় আত্মসন্ধানের দরজা, যেখানে ব্লুজ নোটের ব্যবহার গানটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। আর আলাদা করে বলতে হয় ‘তোমাকেই বলে দেবো’-র কথা। সঞ্জীব চৌধুরীর লেখা ও গাওয়া এই গানটি দলছুটের পরিচয় হয়ে উঠেছে। মেলো-রক ধারার এই গানটির চিত্রকল্প, কথা আর সুর আজও শ্রোতাদের গভীরভাবে স্পর্শ করে। সাউন্ডটেকের ব্যানারে প্রকাশিত ‘হৃদয়পুর’ ২৫ বছর পার করেও সতেজ। এই অ্যালবামের গানগুলো কেবল শোনা হয় না, অনুভব করা হয়। সময় বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু কিছু গান থেকে যায় মানুষের হৃদয়ের ভেতর। ‘হৃদয়পুর’ ঠিক তেমনই এক চিরসবুজ স্মারক।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও দেখুন
Close
Back to top button