সবাইকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার যে চিত্র প্রকাশ করেছে, তা আমাদের জাতীয় জীবনে এক গভীর সংকেত বহন করছে। মাত্র এক মাসে ৫৪৭টি দুর্ঘটনায় ৫০৩ জন নিহত এবং এক হাজারের বেশি মানুষ আহত হওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এই সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি সমাজের ক্ষতি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার- মোট নিহতের প্রায় ৪০ শতাংশই মোটরসাইকেল চালক বা আরোহী। এটি স্পষ্ট করে যে তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেল ব্যবহারের প্রবণতা বাড়লেও নিরাপত্তা সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভয়াবহভাবে দুর্বল। প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুদের সংখ্যা যথেষ্ট। পথচারী নিহত হয়েছেন শতকরা ২৬ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ সড়কে চলাচলকারী সাধারণ মানুষও নিরাপদ নন। চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন শতকরা ১২ শতাংশের বেশি, যা প্রমাণ করে যে পেশাদার চালকদেরও যথাযথ প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা নেই। একই সময়ে নৌ ও রেল দুর্ঘটনায়ও প্রাণহানি ঘটেছে, যা পরিবহন ব্যবস্থার সামগ্রিক দুর্বলতাকে সামনে আনে। যানবাহনভিত্তিক পরিসংখ্যান আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। মোটরসাইকেল, থ্রি-হুইলার ও স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনগুলোতে প্রাণহানির হার বেশি। এগুলো সাধারণত অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলে এবং সড়কে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে। জাতীয় ও আঞ্চলিক সড়কে দুর্ঘটনার হার সর্বাধিক, যা নির্দেশ করে মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগে বড় ঘাটতি রয়েছে। দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিয়ন্ত্রণ হারানো ও মুখোমুখি সংঘর্ষই প্রধান কারণ। এর মানে চালকদের দক্ষতা, যানবাহনের মান এবং সড়কের অবস্থা- সবকিছুতেই ত্রুটি রয়েছে। বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে, আর বরিশালে সবচেয়ে কম। রাজধানী ঢাকায়ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দুর্ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের পেশাগত পরিচয় বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সমাজের সব স্তরের মানুষ- শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী- কেউই এই বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়: আমরা কি সড়ক নিরাপত্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি? আইন প্রয়োগ, চালক প্রশিক্ষণ, যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ, পথচারীর নিরাপত্তা- সব ক্ষেত্রেই ঘাটতি স্পষ্ট। শুধু প্রতিবেদন প্রকাশ করলেই হবে না; এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সড়কে গতি নিয়ন্ত্রণ, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার নিশ্চিত করা, অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন বন্ধ করা এবং সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন করা জরুরি। প্রতিটি মৃত্যু আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। সড়ক দুর্ঘটনা আর নিছক দুর্ঘটনা নয়; এটি এখন জাতীয় সংকট। তাই সরকার, পরিবহন মালিক, চালক, পথচারী- সবাইকে একসঙ্গে দায়িত্ব নিতে হবে। অন্যথায় প্রতিদিনই আমরা নতুন নতুন শোকের সংবাদে নিমজ্জিত হবো।
