কুয়াকাটা শহর রক্ষা বাঁধে ফাটল, সরে যাচ্ছে সিসি ব্লক

প্রবাহ রিপোর্ট ঃ পর্যটননগরী কুয়াকাটার শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে সিসি ব্লক সরে যাওয়া ও দেবে যাওয়ায় নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চৌরাস্তা থেকে লেম্বুর বন পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকার বাঁধে সুরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শুক্রবার (১০ জুলাই) সরেজমিনে দেখা যায়, কুয়াকাটা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপুর দাখিল মাদরাসা সংলগ্ন সানসেট পয়েন্ট এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডের আশিঘর সংলগ্ন অর্কা পল্লী এলাকায় অন্তত দুটি স্থানে সিসি ব্লক সরে গেছে। কোথাও কোথাও ব্লক দেবে গিয়ে বড় ফাটল ও ফাঁকা অংশের সৃষ্টি হয়েছে। এতে বাঁধের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বর্ষা, জলোচ্ছ্বাস ও বৈরী আবহাওয়ার সময় ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে একাধিক স্থানে ব্লকের নিচ থেকে বালি ও মাটি সরে যাওয়ায় ব্লক দেবে গেছে। দ্রুত সংস্কার না করলে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভাঙন বা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। কুয়াকাটা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জেলে মোহাম্মদ হানিফ বলেন, আমরা খুবই চিন্তায় আছি। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। গত বছর একটি স্থানে ব্লক সরে গিয়েছিল। এ বছর নতুন করে আরও দুটি স্থানে একই সমস্যা দেখা দিয়েছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, ২০১০ সালের দিকে জিও ব্যাগে বালি ভরে কুয়াকাটা শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (সিইআইপি-১)-এর আওতায় ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাঁধটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। পোল্ডার-৪৮ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৪৩ কিলোমিটার বাঁধ-কাম-সড়ক, স্লোপ প্রটেকশন এবং আধুনিক প্রযুক্তির একাধিক স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। উপকূলীয় জনগণকে জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি পর্যটননগরী কুয়াকাটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। তবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে সিসি ব্লক সরে যাওয়া, ধসে পড়া এবং মূল কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় নির্মাণমান ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। কুয়াকাটা ইসলামপুর দাখিল মাদরাসার সুপার সৈয়দ মো. ফারুক বলেন, সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অতীতে আমরা দেখেছি, বেড়িবাঁধের বাইরের অন্তত ১০টি স্থান সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এখন বাঁধের ভেতরের স্কুল, মাদরাসা, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও হুমকির মুখে রয়েছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের অর্থ সম্পাদক ও হোটেল খান প্যালেস কুয়াকাটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাসেল খান বলেন, শহর রক্ষা বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো দ্রুত ও টেকসইভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন। বাঁধের ভেতরে শত শত হোটেল-মোটেল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি রয়েছে। বর্ষা ও বৈরী আবহাওয়ার আগে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত সংস্কার কাজ শুরুর দাবি জানাচ্ছি। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ বাঁধে অল্প সময়ের মধ্যেই এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা দ্রুত কারিগরি তদন্ত, নির্মাণ মান যাচাই, ক্ষতিগ্রস্ত অংশের স্থায়ী সংস্কার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ইয়াসীন সাদেক বলেন, শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে সিসি ব্লক সরে যাওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলো পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, কুয়াকাটা সৈকতের ১১ দশমিক ২ কিলোমিটার এলাকায় দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ২০২৪ সালে প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বর্তমানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি সৈকত ভাঙন রোধে বিকল্প আরেকটি প্রস্তাবও প্রস্তুত করা হচ্ছে। শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ব্লক সরে যাওয়া ও ভাঙনের বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।


