স্থানীয় সংবাদ

ভারী বৃষ্টিতে ডুবল খুলনা : ১৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড

# জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮২৩ কোটি টাকা প্রকল্প ও ড্রেন ব্যবস্থার কার্যকারীতা নিয়ে প্রশ্ন #
# নগরবাসীর প্রশ্ন এই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান কবে হবে ?

স্টাফ রির্পোটার ঃ আকাশ থেকে ভারী বৃষ্টির ফোটা পড়লেই নগরবাসীর জলাবদ্ধতা থেকে রেহায় মিলছেনা। শুরু হয়েছে বর্ষা কাল, খুলনায় ভারী বৃষ্টির কারনে ৫১ ঘন্টার ১৮৪ মিটার বৃষ্টিপাতে মহানগরীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও নি¤œাঞ্চল ডুবে যাচ্ছে। ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় নগরীর গুরুত্বপূর্ন সড়কগুলোর কোথাও হাঁটুজল, কোথাও কোথাও তারও বেশি। টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় পড়ে কর্মব্যস্ত নগরবাসী, স্কুল-কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থী, রিকশা ও ইজিবাইকচালকসহ সর্বস্তরের মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন। ভুক্তভোগীসহ সচেতন মহল খুলনা জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮২৩ কোটি টাকা প্রকল্প ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকারীতা নিয়ে প্রশ্ন ছুড়েছেন। তারা কেসিসির প্রতি আরও প্রশ্ন ছুঁড়েছেন-‘ এই জলাবদ্ধতা হতে তারা স্থায়ী সমাধান পাবেন?
খুলনা আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, খুলনায় ৫১ ঘন্টায় মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৮৪ মিলিমিটার। যেহেতু বর্ষাকাল চলছে, এসময় স্বাভাবিক ভাবেই বৃষ্টি অব্যহত থাকে। সারা দেশে ন্যায় খুলনায়ও ভারী বৃষ্টিপাত অব্যহত রয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাতের কারনে খুলনা শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবে গেছে। তবে সচেতন মহল বলছেন, বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে এটা স্বাভাবিক, তবে পরিকল্পিত ও উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকার দরুন খুলনায় সামান্য বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের আওতায় গত সাড়ে পাঁচ বছরে সাতটি খাল খনন ও দুই শতাধিক ড্রেন নির্মাণ-সংস্কার করা হলেও মিলছেনা সমাধান। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নগরীর সামগ্রিক জলপ্রবাহ, খালের ধারণক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নগরায়ণের বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি। পর্যাপ্ত গবেষণা ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে অনেক স্থানে বড় প্রাকৃতিক খাল সংকুচিত হয়ে ড্রেনে পরিণত হয়েছে।
দৌলতপুর ঋষিপাড়া মোড় এলাকার ব্যবসায়ী মোস্তফা জানান, সামান্য বৃষ্টি হলেই আমাদের এই মোড়টিতে হাটুজল জমে। জলাবদ্ধতায় চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়ে। গত দুদিনে বৃষ্টিতে মোড়টিতে হাটুজল জমে। এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহনের জন্য কেসিসির হস্তক্ষেপ কামনা করছি। পাবলা কারিকর পাড়া এলাকার বাসিন্দা হামিম জানান, একটু বৃষ্টি হলেই হচ্ছে, বাড়ী-ঘর পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। যতবার বৃষ্টি হচ্ছে, ততবারই আমাদের বাড়ির নিচতলায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি যাচ্ছে। আগেও বৃষ্টি হলে দুর্ভোগে পড়তাম, কিন্তু এক দিনে পানি সরে যেত। এখন বিপদ হয়েছে অন্য রকম, আমাদের এলাকায় পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই।’ প্রায় এক বছর আগে কবীর বটতলা থেকে কারিগরপাড়া পর্যন্ত আমাদের এলাকার সড়ক ও পাশের ড্রেন প্রায় তিন ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বাড়িঘর থেকে ওই ড্রেনে বৃষ্টির পানি যাওয়ার কোনো কার্যকর সংযোগ রাখা হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়ির উঠান ও নিচতলা পানিতে তলিয়ে যায়। পাবলা সাহাপাড়া এলাকার বাসিন্দা অনুপ কুমার জানান, খুলনার জলাবদ্ধতার মূল কারণ শুধু অপর্যাপ্ত ড্রেন নয়, এটি একটি পরিকল্পনাগত সংকট। গত কয়েক বছরে অনেক প্রাকৃতিক খাল সংকুচিত করে কংক্রিটের ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে পানির ধারণক্ষমতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ দুটোই কমে গেছে। একইসঙ্গে নদী-খালের সঙ্গে শহরের নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা যায়নি। শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করে টাকার অপচয় করলে হবে না, প্রাকৃতিক খালের ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু ও নদী-খালের সঙ্গে নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা না গেলে খুলনার জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলবে না। বাস্তহারা এলাকার বাসিন্দা রাজীব জানান, আকাশ থেকে সামান্য পানি পড়লেই আমাদের এলাকায় হাটুজল পানি জমে। গত দুদিনের বর্ষা গোটা এলাকা তলিয়ে গেছে। ঘরে মধ্যে পানি ঢুকে গেছে। আমরা এই জলাবদ্ধতার একটা স্থায়ী সমাধান চাই। ইজিবাইক চালক হাফিজ জানান, দুদিন ধরে বর্ষা। ঘরে বসে থাকলে তো আর পেটে ভাত যাবে না। মুজগুন্নি রাস্তায় হাটুজল। অনেকে রাস্তায় জাল ফেলে মাছ ধরছে। একটু বৃষ্টি হলেই সড়কে হাটুজল জমে। কোটি টাকা খরচ করে রাস্তা-ড্রেন বানাচ্ছে, কিন্ত আমাদের দুর্ভোগ কমছে কই? খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) সূত্র অনুসারে, নগরীতে মোট ড্রেনের দৈর্ঘ্য প্রায় এক হাজার ১৬৫ কিলোমিটার। খুলনা সিটি করপোরেশনের ‘খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় গত কয়েক বছরে খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ হয়েছে। এই প্রকল্পের পরিচালক খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ মাসুদ করিম বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ব্যাসার্ধের ১৪৭ কিলোমিটার ১৬৯টি ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। এর সবগুলোই ঢাকনাযুক্ত ড্রেন। খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান কনজারভেন্সি অফিসার মো. আনিসুর রহমান বলেন, আমরা নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করছি। গত কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে আমরা আপাতত এই কাজ বন্ধ রেখেছি। কারণ ড্রেন থেকে তোলা নরম কাদা মাটি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে আবার ড্রেনে চলে যাচ্ছে। খুলনার জলাবদ্ধতার মূল কারণ শুধু অপর্যাপ্ত ড্রেন নয়, এটি একটি পরিকল্পনাগত সংকট। গত কয়েক বছরে অনেক প্রাকৃতিক খাল সংকুচিত করে কংক্রিটের ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে পানির ধারণক্ষমতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ দুটোই কমে গেছে। একইসঙ্গে নদী-খালের সঙ্গে শহরের নিষ্কাশন ব্যব¯ার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা যায়নি। তিনি বলেন, নতুন নির্মিত ঢাকনাযুক্ত ড্রেন পরিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি বা বিশেষায়িত মেশিন সিটি করপোরেশনের কাছে নেই। ফলে শ্রমিকরা ভারী স্ল্যাব একটা একটা করে খুলে পরিষ্কার করেন। এটা সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। অনেক স্থানে আবর্জনা জমে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চলমান প্রকল্পের আওতায় আধুনিক ময়লা পরিষ্কার করার যন্ত্র কেনার ব্যবস্থা রাখা আছে। যন্ত্র এলে পরিষ্কার করার কাজটা আরও সহজ হবে। খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, মূলত শহরের পানি রূপসা নদীতে নামতো। সেটি নামছে না। কিন্তু বিগত সরকারের সময়ে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ড্রেনের কাজ সময়মতো শেষ না করা, রূপসার পাম্প হাউজ বন্ধ, স্লুইচ গেটগুলো অকেজো থাকায় নগরীতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া জোয়ারের সময় এক ঘন্টার বৃষ্টিতেই নগরীর রাস্তাগুলো ডুবে যাচ্ছে। ড্রেন আগে যেভাবে ছিল, সেভাবে নেই। ড্রেনগুলোর বেড উচু করে ফেলায় বাড়িগুলো নিচু হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতে রাস্তা ও বাড়ির মধ্যে পানি প্রবেশ করছে। মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা মাত্র তিন মাস দায়িত্ব নিয়েছি। এরমধ্যে আমরা দিন-রাত এই সংকট নিরসনে কাজ করে যাচ্ছি। পানি নিস্কাশনের বাধা দূর করছি, ড্রেনের ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার করা হচ্ছে। নগরবাসীর দূর্ভোগ লাঘবে সব চেষ্টা করছি। সমাধানের পথ খুঁজছি। তিনি নগরবাসীকে ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থান ডস্টবিনে ফেলার আহ্বান জানান।

সংশ্লিষ্ট সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button